ছায়ামূর্তি

তোফাজ্জল হুসাইন

0
814
kake golpo

নিউইয়র্কে  আয়োজিত “বেষ্ট ফটোগ্রাফি এওয়ার্ড” অনুষ্ঠানে বসে আছি। আমার স্যার সাখাওয়াত সাহেব সৌখিন মানুষ। সখের বসে ফটোগ্রাফি করেন। ফটোগ্রাফির ওপর স্নাতকোত্তর করছেন ফালমাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে। উনি পুরনো স্থাপনা এবং প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের উপর একটি ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফি করেন। সে জন্যই আজ ইন্টারন্যাশনাল ফটোগ্রাফি এ্যওয়ার্ড পাচ্ছেন।  আমি তার অ্যাসিস্টেন্ট । ইন্টারমিডিয়েট পড়ার পর পরিবারের বেড়াছেড়া অবস্থার কারণে আর পড়তে পারিনি। চাকরির খোজে শহর থেকে শহরে ছুটেছি। অবশেষে উনার সাথে সাক্ষাৎ।

তার সাথে গত বেশ কয়েক বছর  ধরে কাজ করছি। আমার বেশ ভালোই লাগছে। ফটো তোলা যেমন তার শখ তেমনি আমারও। তাই বলা যায় এই চাকরিটা উপভোগ করেই করা হচ্ছে।

এখন আসি মূল গল্পে। “প্রকৃতি ও পাখি” সিরিজের ফটোগ্রাফির জন্য আমাদের নির্জন একটা বনের প্রয়োজন। যেখানে বড় বড় গাছ থাকবে। জনমানবহীন বিরাট এলাকা জুড়ে থাকবে শুধু গাছ আর গাছ। একটাই রব থাকবে চারদিকে,আর তা হলো  হলো পাখিদের কিচিরমিচির। আরো বিভিন্ন ভাবে তিনি আমাকে থিমটা বুঝানোর চেষ্টা করলেন।

আমিও সে মতেই একটা জায়গার খোজ দিলাম। শ্যামনগর। আমাদের গ্রামের দুই গ্রাম পরেই শ্যামনগর। এলাকা দেখতে একদিন স্যার আমাকে নিয়ে রওনা হলেন। জায়গাও পছন্দ হলো তার। সেদিনই একটু দূরে কটেজ বুকিং করে আসলাম। কটেজ বলতে, গ্রামে কোন রিসোর্ট বা হোটেলের ব্যবস্থা নেই। অনেক দিনের পরে থাকা প্রায় পরিত্যক্ত একটা বাড়ি।  সেখানেই থাকবো বলে ঠিক করলাম আমরা। পুরো এক মাস সেখানে থেকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন আঙ্গিকে  ছবি তুলা হবে।

সকল প্রস্তুতি নিয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। গ্রামে স্যার এর আগে খুব কমই এসেছেন। ডিসেম্বরের দশ তারিখে আমরা এখানে এসেছি। শীত কাল। একেবারে ঝাকিয়ে শীত পড়েছে গ্রামে। ছবি তোলার পাশাপাশি গ্রামে থাকার একটা অভিজ্ঞতাও হবে। স্যার এটা নিয়ে বেশ আনন্দিত।

কটেজে এসেছি আজ চারদিন হলো। কিন্তু ছবি তোলা নিয়ে স্যারকে একটুও ভাবতে দেখলাম না। উনি খুব সকালে ঘুম থেকে উঠছেন। চায়ের পট সাথে নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন। ফিরছেন বেলা মাথার উপর করে। বিকালে ছাদে হাটাহাটি করছেন । রাতে পুকুর পারে বসে থাকছেন। ব্যস এই ক’দিনে তার  রুটিন। আমি শুধু কথামতো এটা ওটা করছি।

এখানে বলে নেওয়া উচিৎ , আমরা যে বাড়ীতে উঠেছি এটা প্রথমে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপাসনালয় ছিল । পরবর্তী সময়ে কোন এক দাপটে লোক নিজের বাসগৃহ করে নেন। এরপর বছরের পর বছর এভাবেই পরে ছিল। তাদের পিড়ির পর  পিড়ি এটার দেখাশোনা করছেন। কায়সার সাহেব তাদের ষষ্ঠ পিড়ি।

পঞ্চম দিনে স্যার আমাকে ডেকে বললেন, তিনি নাকি সিদ্ধান্ত পাল্টেছেন। “পুরনো স্থাপনা এবং ধ্বংসাবশেষ” সমূহের ছবির ডকুমেন্টারি করবেন। আমি এতে কোন রকম আশ্চর্য হয়নি। তার মতিগতি এটুকু এই কয়দিনে আমার জব্দ হয়েছে। তাই সে রকম প্রস্তুতি নিয়েই বের হয়েছি। কাল থেকে ফটোসেশন শুরু হবে, আমাকে জানিয়ে দেওয়া হলো সে মতো প্রস্তুত থাকতে। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে সকল ক্যামেরার চার্জ দেওয়া সম্পন্ন করে নিয়েছি। রিফ্লেক্টর ফ্রেমে লাগিয়ে রেখেছি। যদিও এই শীতে রোদ উঠবে না এবং এটা কোন কাজেও আসবে না। সকল লেন্স সহ প্রয়োজনীয় সবকিছু ব্যাগে নিয়ে রেখেছি। প্রথম দিনের স্থান এই বাড়িই ঠিক করা হয়েছে। আর সাবজেক্ট পুরনো দেয়াল।

আজকে সকালে স্যার খুব তাড়াতাড়ি বাড়িতে ফিরেছেন। আমি বারান্দায় একটা রশি টাঙাচ্ছি। স্যার বললেন,  ডি৮০ টা নিয়ে আসো তো! আমি উপরে গেলাম, নিকন ডি৮০ মডেলের ক্যামেরা নিয়ে আসলাম। কিট লেন্স লাগানো ক্যামেরাটি দিয়ে স্যার  সব ধরণের ছবি তুলেন।  এই ঘন কুয়াশার মধ্যে কি ছবি তুলবেন বুঝতে পারছি না। স্যার বাড়ীর দেয়ালটাকে সাবজেক্ট ধরে এঙ্গেল  নিলেন। পুরনো ইটের দেয়াল। উপরে কোন আস্তরণ নেই। এখনকার তৈরী দেয়াল গুলো থেকে প্রায় চার পাচ গুণ পোক্ত । ছোট ছোট আগাছায় দেয়ালটা প্রথম নজরে মনে হবে সবুজ রঙ করে রাখা। শিশিরের ছোট বিন্দুতে আগাছা গুলো আরো সজীব এবং জীবন্ত লাগছে। স্যার এই ব্যাপারটাই ক্যামেরা বন্দী করতে চাচ্ছেন।

আমি পাশে দাড়িয়ে আছি। স্যার আমার দিকে বিরক্ত হয়ে তাকালেন। হয়তো কয়েকটা ক্লিকে ব্যর্থ হয়েছেন। সেটিং পরিবর্তন করে আবার কয়েকটা ক্লিক নিলেন। আগের রাগী চেহারায় আমার দিকে ফিরলেন  আবার। ধমকের স্বরে বললেন, কি এনেছো এটা? ক্লিক হচ্ছে না কিছুই! 75-300 লেন্স টা নিয়ে আসো…. আমি দৌড়ে উপরে গেলাম লেন্স আনতে। যেই রুমে ঢুকতে যাবো তখন দেখলাম সামনের রুমটার ভেতরে কেউ ঢুকেছে। বাড়ীতে আমরা দুজন ছাড়া আর কেউ থাকার কথা না। বাড়ীটা লোকালয় থেকে অনেকটা দূরে। থমথমে নির্জন!

আমি লেন্স নিয়ে সিঁড়ি ভেঙে নিচে নামার সময় পেছনে কারো দৌড়ে যাওয়ার শব্দ পেলাম। এখন আর ব্যপারটা এড়াতে পারলাম না। নিশ্চিত কোন মেয়ে মানুষ! চালচলনে তেমনি বুঝা যাচ্ছে। পেছনে তাকিয়ে দেখলাম কেউ নেই। বাহিরে স্যারের ডাক শোনা যাচ্ছে। স্যার আজ এতো ক্ষেপে যাচ্ছেন কেন তাই-ই বুঝতে পারছি না।

লেন্স লাগিয়ে আবার চেষ্টা করলেন। কিন্তু যেই সেই। ছবি উঠছেই না। স্যার রাগে খটখট করে উপরে চলে গেলেন। আমি ক্যামেরার ব্যাগ ট্যাগ নিয়ে ভেতরে ঢুকবো। এমন সময় চোখ গেল ছাদে। মনে হলো কেউ এতক্ষণ আমাদের দেখছিলো। আমি তাকানোর সাথে সাথে আর নেই। বাতাসের সাথে হাল্কা একটা উপহাসের হাসি কানে এলো।

আজ রোদ উঠেনি একবারও। স্যার বিকালে ছাদে হাটাহাটি করছেন। রাতে খাবার সময় খেয়াল করলাম স্যার কেমন উদ্ভট আচরণ করছেন। রাতে স্যার প্রতিদিন দুটো রুটি খান। ডায়েবিটিস জনিত সমস্যায় তার খাবার দাবার বেশ নিয়ম মতো হয়। কিন্তু তিনি বললেন আজ ভাত খাবেন। আমি রান্না চড়ালাম। খুব অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম তার দিকে। সব ভাত একাই খেয়ে ফেললেন! হাতমুখ ধুয়ে ঘুমাতে যাবার আগে রুমে যাওয়ার সময় আমাকে বলে গেলেন, কাল যেন কোন ক্যামেরায় সমস্যা না দেখা দেয়। সব ঠিক ঠাক করে যেনো রাখি।

সকালে স্যার ঘুম থেকে উঠলেন না। আমি কয়েকবার দরজায় উঁকি দিয়ে আসছি। তিনি ঘুমাচ্ছেন। স্যার প্রতিদিন খুব ভোরে হাটতে বেরুতেন। আজকেই তার ব্যতিক্রম হলো। স্যার ঘর থেকে বের হলেন বেলা পশ্চিমে হেলে যাওয়ার অন্তিমসময়ে। উঠে তড়িঘড়ি করে বাহিরে এসে আমাকে কর্কট গলায় হাঁকলেন। ক্যামেরা কোথায়, কি হলো! সব কিছু কোথায়? তালাবদ্ধ করে রেখেছো নাকি? নিয়ে আসো…! আমি স্যারের প্রিয় ক্যামেরা নিয়ে দৌড়ে বেরুলাম। হঠাৎ আমার চোখে একটা ধাধা আটকালো। স্যারের রুমে কেউ শুয়ে আছে!

 তাড়াহুড়ায় খেয়াল করতে পারিনি। গত দু’দিনে কিছু উদ্ভট ঘটনার একটা জটলা আমার মাথায় ঘুরছে। ঘরে কারোর হাটার শব্দ। ক্যামেরায় ছবি না উঠা, ছাদে কাউকে দেখা। স্যারের গত রাতের খাবারের ঘটনা সহ আরো ছোট খাটো কিছু ব্যপার আমাকে ভাবাচ্ছে।

 স্যার পুকুর ঘাটে কি যেন একটা ছবি তুলার চেষ্টা করছেন। আমাকে ধমক দিয়ে পাঠিয়ে দিলেন। দূরে যাও। কাছে বিছে ঘুর ঘুর করো না। মানুষটার কি হলো বুঝতে পারছি না। হঠাৎ এমন ক্ষিপ্ত আচরণ কেন করছেন?

সন্ধ্যাবেলা স্যার একটা বই নিয়ে বসলেন। আমি চা দিয়ে এসে রান্না বসালাম। কায়সার সাহেব আসছেন একটু আগে। স্যারের সঙ্গে গল্প করছেন। তার সাথে দেখা হবার সাথে সাথেই সকল কৌতূহল জড়ো হয়ে মাথায় যন্ত্রণা শুরু করেছে। আমি কায়সার সাহেবকে কিছু প্রশ্ন করলাম বাড়ীটা সম্পর্কে। উনি থতমত করে আমাকে এড়িয়ে গেলেন। আমার কৌতূহল আরো গাঢ় হতে থাকলো। রাতের খাবারের সময় স্যার আমাকে জানালেন কাল বাহিরে ছবি তুলবেন। এতোদিন হয়ে গেলো কাজ কোন দিকেই এগুচ্ছে না। খেয়েদেয়ে স্যার ঘরে চলে গেলেন। আমি সব গোছগাছ করছিলাম। হঠাৎ জেনারেটর চলে যায়। মোমবাতি জালিয়ে জেনাটরটা দেখতে নিচে যাচ্ছি।

এখানে কারেন্ট, গ্যাস কিচ্ছু পাবো না জেনেই, এলপি গ্যাস আর একটা নতুন অটো জেনারেটর নিয়ে আসি। এটার আবার হঠাৎ কি হলো। সিঁড়ি ভেঙে নিচে নামার সময় সহসা বাতাস এসে মোমবাতি নিবে গেলো। সাথে সাথেই কেউ  আমাকে অতিক্রম করে উপরে উঠে গেলো। একটা মাতাল করা ঘ্রান আমাকে স্পর্শ করে দিলো সে সাথে । আমি স্তব্দ হয়ে দাড়িয়ে রইলাম। স্যার জোরে চিল্লাতে চিল্লাতে বললেন, কী! জেনারেটর বন্ধ হলো কেন? সমস্যা কী? আমি মোমবাতি জ্বালিয়ে নিচে জেনারেটর চালু করে দিয়ে আসলাম।

সকাল সকাল স্যার ক্যামেরা নিয়ে বের হয়ে পড়লেন। বাড়ী ফিরে হতাশ মুখে বললেন, এবার একটা ছবিও তো তুলতে পারছি না। শেটট!

স্যার হঠাৎ আমাকে নিয়ে ছাদে আসলেন। পাকা করা কবুতরের ঘর। খুব চমৎকার ডিজাইন করা। আমি এই প্রথম ছাদে এসেছি। বিশাল বড় ছাদ। ভেতর থেকে বুঝা যায় না এতো বড় বাড়ি। এখন মনে হচ্ছে আমরা এতোদিন এক কোণায় পড়ে ছিলাম। আমার দৌড়াতে ইচ্ছে করছে। বিশাল বিশাল ইটের স্তুপের মতো করে বসার যায়গা। সামনের দিকটাতে ছোট ছোট গম্বুজ তার উপর কলসির নকশা। রাজবাড়ীর মতোন। স্যার কবুতরের খুপরি, কবতুর এবং ডিম সহ বাসার কিছু ছবি তুলেন। তারপর নিচে আসেন। ভেতরে পুরো বাড়ীটি আজ ঘুরে ঘুরে দেখলাম। একটা ঘরে দেয়ালে একটা চিত্র আকা। স্যার এটা দেখে খুব খুশি। এতোদিনে ছবি তুলার মতো একটা জিনিষ পেয়েছে। অনেক এঙ্গেল  থেকে ছবি তুলা হলো। আরো বিভিন্ন জিনিষের ছবি তুলেন পর্যায়ক্রমে।

স্যারের অনুপস্থিতিতে আমি পুরস্কারটি গ্রহণ করি। এই ডকুমেন্টারি ছবি গুলোর অনেক সুনাম সুখ্যাতি দেশে ছড়িয়েছে। বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় ছাপা হয়েছে৷ অনেক কোম্পানির আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রথম পুরস্কারের স্থান পেয়েছে।

শ্যামনগর থেকে আসার পর হঠাৎ হঠাৎ স্যার অসুস্থ হতে থাকেন। জ্বর উঠে। ডাক্তাররা ট্রিটমেন্ট নিয়ে মিটিং করেন। ঔষধ দেন। কোন লাভ হয় না। শক্ত জ্বর। শুধু আগুন ধরা বাকি শরীরে। বিদেশ থেকে চিকিৎসা করানো হয়। উপকার হচ্ছে না কোন। একদিন কায়সার সাহেব দেখতে এলেন৷ বলতে গেলে অসুস্থতার জন্য আসেননি। স্যারের কিছু বইপত্র আর একটা ব্যাগ ফেলে আসা হয়েছিল। সেগুলো দিতে এসেছেন। স্যারকে এমন অসুস্থতায় দেখে উনি মর্মাহত হলেন। কিন্তু আমি তার চেহারায় তীব্র ভয় দেখতে পেয়েছি। তার শরীর সহসা কেঁপে উঠেছে স্যারের অবস্থা দেখে। কোন কিছুই আমার চোখ এড়ায়নি। এর কিছুদিন পরই স্যার মারা যান।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here