কেবিনের নাম ভি.আই.পি!

0
169
bangla love story facebook

bangla love story facebook

– জলিল!
– জ্বে আব্বা!
– লঞ্চো বেশি ঘুরফির কইরো না।
– এট্টু উপ্রের তোন হাইট্টা আহি গা?
– হেয়া যাও। তয় দেইখ্যাহুইন্যা!

বাবার কাছ থেকে অনুমতি পাওয়া মাত্র জলিলের আর তর সয় না। সে পারলে একনজরে দেখে নিতে চায় জলের মাঝে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল জলদানবের শুরু থেকে শেষ অবধি, নিজের চোখকে তৃপ্তি করাতে চায় রঙ্গিন আলোয় রূপকথায়। জলিল একপ্রকার দৌড়ে সিড়ির কাছে চলে আসে। সে সাবধানে সিড়ির ধাপগুলো একে একে নিচে ফেলে ক্রমেই অগ্রসর হতে থাকে। সে উত্তেজনার আবেশে লক্ষ্য করে না কিছুই, তাকে স্বাগত জানায় লাল রংয়ে লেখা তিনটি শব্দ “প্রথম শ্রেণীর সিড়ি”।

বাবার সাথে ঢাকার পথে চলছে জলিল। গ্রামের আলো বাতাসে বেড়ে ওঠা বছর বারোর কিশোর। দরিদ্রতার আঘাত রুখে অভাবের সংসারে একটুখানি হাসি ফোটাতেই এবার বাবার সাথে তার এই যাত্রা। জীবন সংগ্রামের পথে ৪র্থ শ্রেণীর বেশি তাই আর পার করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি কৈশোর সংগ্রামে নিজেকে সঁপে দেয়া জলিলের পক্ষে।

গাঢ় লাল রংয়ে লেখা ‘প্রথম শ্রেণী’র সিড়ি ধরে দ্বিতীয় তলায় পা রাখা মাত্র জলিলের শরীরে স্পর্শ জাগায় তীব্র বাতাসের শীতল রূপ, সে টের পায় বাতাসে চুলের দোলাচল। সামনে তাকায় জলিল, বিশাল নদীবক্ষ বিস্মিত করে তোলে তার কৈশোরের মায়াভরা চোখকে। বছর বারোর কিশোরের মনকে আরেকটু বিস্ময় উপহার দিতেই কিনা মাথার উপর জ্বলে উঠলো হরেক রংয়ের বাতি; লাল, নীল, হলুদ, বেগুনী এবং আরো হরেক রকম নিয়ন আলো।

হুট করে উপরে তাকায় জলিল, নিজের চোখকেই সে বিশ্বাস করতে পারছে না। বিশাল নদীর বুকে নিয়ন আলো ছড়িয়ে রাজহংসের মতো তরতর করে এগিয়ে চলছে এক যন্ত্রদানব আর সে তার সওয়ারি, রংগুলো যেন ছুঁয়ে দিতে চায় জলিল। সম্ভব হয়ে ওঠে না!আনমনে করিডর ধরে এগিয়ে যায় সে। চোখে পড়ে সারি সারি দরজা, তার উপরে ইংরেজী সংখ্যায় লেখা নাম্বার। ব্যাপারটা ঠিক বুঝে উঠতে পারে না সে। জলিল ভাবে, বাবার কাছে প্রশ্ন করে সে জেনে নিবে।

এসব ভাবতে ভাবতে, সারি সারি দরজাগুলোর নাম্বার মেলাতে মেলাতে হুট করে আলোকসজ্জিত এক বিশাল দরজার কাছে এসে থেমে যায় কিশোর জলিল। চোখের পাতা যেন পড়ে না তার, এত সুন্দর দরজাওয়ালা বাড়ী সে দেখেছে ছবিতে। এটাই কি সেই বাড়ী? জলিলের চোখ চারপাশে ঘুরেফিরে হুট করে স্থির হয়ে গেলো দরজার ঠিক উপরে লেখাটার দিকে। তিনটি বড় হাতের ইংরেজী অক্ষর পরপর সাজানো ‘ভি.আই.পি’! জলিলের উৎসুক মন ভিতরে তাকাতে যাবে অমনি হুংকার,

– ল্যাদা! এইহানে কি চাস তুই?
– বাতি দেহি মিয়াবাঈ!
– কয় কি! আরে সর সর..ছার আইতাছে।

জলিলের মন খারাপ হয়ে যায়। তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়েছে কেবিন বয়। তার সামনে দিয়ে আলোকসজ্জিত সেই কামরায় প্রবেশ করলেন প্রায় কেশহীন এবং বাটারফ্লাই গোফের স্থুলকার এক ভদ্রলোক। জলিল আর দাঁড়ায় না, ধীরে ধীরে বাবার কাছে ফিরে আসে। কথায় কথায় সে জেনে নেয়, সারি সারি দরজার গল্প, বিশাল ঐ ঝাড়বাতিওয়ালা কামরার গল্প কিংবা স্থুলকার ঐ লোকের গল্প।

অতঃপর জলিলের দু’চোখ ঘুমে জড়িয়ে আসে, ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে যায় বাবার কোলে মাথা রেখে। হঠাৎ জলিলের ঘুম ভাঙ্গে সাইরেনের শব্দে, প্রকৃতির ডাকে। একমনে বাইরে তাকিয়ে থাকে সে। চোখে ধরা দেয় নদীর দুই ধারের দৃশ্য, পানিতে হলদে আলোর প্রতিবিম্ব কিংবা দূরের আলোর ক্ষীণ অস্তিত্ব। হঠাৎ জলিলের চোখে অদৃশ্য হয়ে ধরা দেয় একটি বড় দরজা, একটি ঝাড়বাতি এবং আলোকিত এক কামরা। সকালের ফুরফুরে বাতাসে সাড়া দেয় জলিলের মস্তিষ্ক। তার চোখের সামনে উপস্থিত হয় তিনটি বড় হাতের ইংরেজী অক্ষর “ভি আই পি”।

সেই অক্ষর তিনটার অর্থ অনুধাবন করা জলিলের ক্ষুদ্র মস্তিষ্কের কাছে দুঃসাধ্য ই মনে হয়। জলদানব পানি কেটে এগিয়ে যায়, জলিল ঢেউয়ের দিকে গভীর মনোযোগ নিয়ে তাকায়। সেই তাকানোতে জলিলের দু’চোখে স্বপ্ন ভাসে। সেই স্বপ্নের অর্থ জলিলকে নিয়ে যায় আরো এক যুগ সামনে। সেদিন এই ঝাড়বাতিরই কামরায় জলিলের আগমনে কেউ হয়তো কোনো কিশোরকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠবে “সর সর..ছার আইতাছে”। কিন্তু জলিল তাতে ভ্রুক্ষেপ করবে না। শৈশবের অপূর্নতাকে সে এবার পূর্নতায় রূপ দিবে কোনো এক কিশোরের বিস্ময়ভরা মায়ায়।

bangla love story facebook

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here