সুত্রপাত

0
762
ধ্রুব খান
– তোমার সিগারেট খাওয়াটা কমানো উচিত।
– কেন?
– মারা যাবা৷
– একদিন এমনিতেও মরতে হবে৷
– বুঝলাম৷ আমি উঠবো৷
– যাও৷
– তুমি যাবে না?
– না।
– কখন যাবা?
– নাফি আসবে। ওর সাথে যাবো।
– কোথায়?
– বাসায়৷
– বুঝলাম। স্পর্শ, তুমি আমাকে একটা প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবা?
– আমি সবসময়ই তোমার প্রশ্নের উত্তর দেই।
– এটাই সমস্যা, আমি তোমাকে যা জিজ্ঞেস করি তুমি সব প্রশ্নের উত্তর দাও।
– এতে কি তুমি রাগ হও?
– জানি না। জানলেও আমি তোমাকে বোঝাতে পারবো না।
– তুমি কখনো নিজেকে বুঝেছ?
– জানি না। চলি। টা টা
স্পর্শ বসে আছে সে জানে কিছুক্ষন পরই তার কাছে দিয়া ফিরে আসবে। আর বলবে-” আমার একটা কথা তোমাকে বলা হয়নি৷ আমি তোমাকে ভালবাসি। চলি” কিন্তু দিয়া এলো না। স্পর্শ চুপচাপ বসে আছে একটা গাছ তলায়। এই জায়গাটাকে তার অনেক অভিশপ্ত মনে হয়৷ কিছু দূরেই একটি কুকুর মরে পরে আছে৷ কুকুরের চোখ দিয়ে কেউ ছুরি ঢুকিয়ে দিয়েছে৷ এরকম একটা পরিবেশে কেন যেন দিয়া সবসময় তার সাথে দেখা করতে বলে৷ হঠাৎ সে অনুভব করলো কেউ তার পিছে হাত রেখেছে। স্পর্শ দিয়া ভেবে পিছে তাকালো কিন্তু দেখলো নাফি দাড়িয়ে আছে৷ মুখে একটা হাসি। কালো চেহারায় যা ফুটে উঠেছে। কিছু মানুষ তার আপন কেউ মারা গেলে একসময় তার চেহারা ভুলে যায় কিন্তু কেউ নাফিকে একবার দেখলে কখনো ভুলতে পারবেনা। তার কালো চেহারা৷ মাথায় টাক গালে একটা দাড়িও নেই৷ ভ্রু অনেক ঘন। নাফি তার খুব কাছের বন্ধু না৷ তবে কিছুদিনের পরিচয়ে তারা অনেক ভালোই বন্ধু হয়েছে৷
– কিরে? চলে গেছে?
– কে?
– যার সাথে এখানে আসিস।
– হুম, চলে গেছে৷।
– বসে আছিস কেন? গাড়িতে আয়। নতুন জিনিস আছে।
নাফি স্পর্শকে টেনে তুলে গাড়িতে নিয়ে গেলো। স্পর্শ সবসময়ই নতুন কিছু আছে শুনলে খুশি হয়ে উঠে। গাড়িতে বসে নাফি একটা ছোট্ট স্টিকার বের করলো আর বললো এটা জিহবার নিচে রাখ। পনের মিনিট পর আকশ্যন শুরু হবে। আশ্চর্যজনক হলেও সে বুঝতে পারছিলো খুব বাজে একটা গান বাজছে গাড়িতে। কিছুক্ষন পর নাফি বলে উঠে।
– নেমে যা, তোর বাড়ি এসে গেছে৷
– কিহ! আমরা তো মাত্রই গাড়িতে চরলাম।
– হা হা কাজ হয়ে গেছে৷ আমরা একঘন্টা ধরে জ্যামে বসে এখানে পৌঁছাছে আর তুমি কি বলছো আমরা মাত্রই গাড়িতে উঠেছি৷
– সরি, যাই।
– কাল আসিস। বিদেশি বোতল আছে৷
– ঠিক আছে।
স্পর্শ বাসায় ঢুকে বুঝতে পারলো তার প্যারালাইজড মা এর সেবা আজ ভালোমতো করা হয়নি৷ বাসায় কাজের মেয়ে থাকার পরও তার মায়ের যথেষ্ট দেখাশোনা হচ্ছে না৷ স্পর্শ তাদের স্টোর রুমের কাছে গেলো তবে সেখানে সে ঢুকলো না। কারণ সেই রুমের ভেতর থেকে সে তার বাবা এবং তাদের কাজের মেয়ের কিছু কথা শুনতে পাচ্ছিল। যা ছিলো আপত্তিকর। কিছুক্ষন পর স্পর্শ বুঝতে পারলো তার নেশা ধরছে৷ তবে কিছুদিন ধরেই তার সন্দেহ হচ্ছে তার বাবা এবং কাজের মেয়ের উপর। স্পর্শ তার রুমে চলে গেলো। বিছানায় শুয়ে পরার সাথে সাথে তার মনে হলো তার শরীরটা বিছানায় আছে তবে মাথাটা কেউ চেপে ধরেছে৷ মনে হচ্ছে বালিশ ভেদ করে মাথাটা কোথাও চলে যাচ্ছে। সে চোখ বন্ধ করলো। কেউ আশেপাশে বন জভির বেড অফ রোওজেস গানটা বাজাচ্ছে। কিছুক্ষন পর তার ঘুম আসতে লাগলো। তবে সে ঘুমাতে চায় না৷ সে তার নেশা উপভোগ করতে চায়। কিন্তু ঘুমের সাথে সে যুদ্ধে জিততে পারলো না।
পরেরদিন সকালে তার ঘুম ভেঙে যাওয়ার পর তার নাকে বাজে একটা গন্ধ লাগলো সে বিছানা থেকে নেমে সেই গন্ধ অনুসরণ করতে লাগলো এবং স্টোর রুমের দিকে যেতে লাগলো সেই সময় সে তাদের বেসিনের আয়নায় দেখতে পেলো একটা কাগজ লাগানো যেটাতে লিখা সে – ” তার আজ সাইকেট্রিস এর কাছে যেতে হবে।
সাউকেট্রিস এর নামঃ রফিক জামান। ৩৩৭ উত্তর শাহাজানপুর। “
স্পর্শ গন্ধ উপেক্ষা করে রান্নাঘরে গেলো, নাস্তা সেড়ে তার জামা চেঞ্জ করলো এবং তালা বন্ধ করে বাসা থেকে বেড় হয়ে গেলো।
রফিক জামান সাহেব পত্রিকা নিয়ে বসে আছেন। তিনি শুধু ছবি দেখছেন৷ এখন সাংবাদিকেরা আকর্ষণীয় হেডলাইন দিতে পারে না। সেজন্য কোন খবরও পড়তে ইচ্ছেও করে না। শুধু ছবি গুলো দেখে যান দেখতে ভালো লাগে। তার বাসায় কিছুদিন ধরে একটি ইদুর ঢুকেছে। পত্রিকার কিছু অংশ খেয়েও ফেলেছে৷ ইদুর মারা ওষুধ কেনা অত্যন্ত জরুরী কিন্তু তিনি বাসা থেকে তিনদিনের জন্য কোথাও যাবেন না বলে মনস্থির করেছেন৷ সে উঠে বসার রুমের দিকে যাচ্ছে৷ একজন তার সাথে দেখা করতে এসেছে৷ রুমে যেতেই রফিক জামান আতকে উঠলেন। তার সামনে যে যুবক বসে আছে তাকে মাত্র কবর থেকে তুলে আনা কঙ্কাল বললে কেউ অস্বীকার করবে না। রফিক জামান সাহেব তার সামনের চেয়ারে বসতে বসতে অনেক কিছু লক্ষ করলো। যুবকটি বসে আছে চোখ বন্ধ করে। রুমে ডুকার সময় তিনি শব্দ করে কেশেছেন তারপরও যুবক চোখ খুলে তাকায় নি। তবে তার পা নারাচ্ছে। তার সামনে খাবার রাখা তারপরও সে কিছু মুখে দেই নি৷ রফিক জামান সাহেব সরাসরি প্রথমে জিজ্ঞেস করলেন- ” আপনার নাম কি?”
যুবকটি চোখ বন্ধ করে উত্তর দিলো -“আমাকে তুমি করে বলবেন আমি আপনার অনেক ছোট এবং আমার নাম স্পর্শ। “
রফিক জামান সাহেব কথা শুরু করার আগে স্পর্শ বলে উঠলো “আপনাকে সালাম দিতে ভুলে গেছি। আসসালামু আলাইকুম। “
রফিক জামান খেয়াল করলেন স্পর্শ চোখ খুলেছে।
– স্পর্শ তুমি কি জানো এখন তোমার ওজন কত?
– জ্বী, সাতাশ।
– এরকম হওয়ার কারণ কি?
– আমি লাস্ট কয়েক মাস ধরে ফল এবং পান্তা ভাত ছাড়া কিছু খেতে পারিনা।
– কেন?
– সব খাবারের মধ্যে মানুষ পোড়া গন্ধ পাই।
– তাই নাকি?
– জ্বী।
– তুমি কি কখনো মানুষ পোড়া গন্ধ পেয়েছিলে?
– জানি না। তবে বুঝতে পারি মানুষের পোড়া চামড়ার গন্ধ এমন হবে।
– এবার তোমার সমস্যাটা বলো।
– স্যার, সমস্যাটা আপনি বিশ্বাস করবেন তার ওয়াদা দেন৷
– শোনো স্পর্শ, আমরা অনেক ধরনের মানুষের সাথে কথা বলে আসছি তাদের সকলের কথাই বিশ্বাস করতে হয়।
– স্যার, আমি কিছুদিন ধরে বুঝতে পারছি আমি দুটি দুনিয়ায় থাকি। আমার অস্তিত্ব এক জায়গায় না৷ স্যার আপনি কি আমার কথা বিশ্বাস করছেন?
– অবশ্যই, বিজ্ঞানীরা এখন প্যারালাল ইউনিভার্স নিয়ে গবেষনা করছেন৷ তারা মনে করেন আমাদের পৃথিবীর মতো আরেকটি পৃথিবী আছে। যেখানে আমার আর তোমার যমজ কেউ আছে যে আমাদের মতই তাদের দিন কাটাচ্ছে৷
– স্যার, আমার ব্যাপারটা অন্যরকম। আমি এই দুনিয়ায় যা করি তা অন্য দুনিয়ায় করি না।
– বিজ্ঞানীরা এখনো সেই ইউনিভার্স নিয়ে সিউর না। সুতরাং তোমার ব্যাপারটাই হয়ত ঠিক। আমি এই দুনিয়ায় যা করছি সে ওই দুনিয়ায় অন্য কিছু করছে৷ হয়ত তুমি কোনোভাবে তোমার যমজ এর সাথে কানেক্টেড হয়ে গেছো।
– স্যার, আমি কি বিস্তারিত বলবো?
– বলো৷
– স্যার, কিছুদিন হলো ব্যাপার টা ঘটছে। আমার এই এলাকায় কোনো বন্ধুবান্ধব নেই। বাবা-মাও আমার সাথে থাকেন না৷ আমি একটা হাসপাতালে একাউন্টেন্ট এর চাকরি করতাম। কিছুদিন আগে আমাকে চাকরি থেকে বের করে দেওয়া হয়। একাকিত্ব থেকে কিছু অদ্ভুদ জিনিস শুরু হলো আমার মাঝে। আমি ঘুমাতে পারতাম না। আমি সারাদিন বাসার বাইরেই ঘুরতাম। রাতে বাসায় এসে ঘুমানোর চেষ্টা করতাম৷ খুব কমই ঘুমাতে পারতাম। অদ্ভুত হলেও সত্য আমার বাসার স্টোর রুম থেকে খুব বাজে পচে যাওয়া ময়লার গন্ধ আসে। যা মাথায় যন্ত্রনা সৃষ্টি করায়। সেই যন্ত্রনা ঘুম চলে আসে। আমি গত কয়েক মাসে বিশ দিনও ঘুমাইনি৷ যেদিন গন্ধটা সহ্য করে বিছানায় শুয়ে থাকতে পারতাম সেই কয়দিন ঘুমাতে পারতাম৷ প্রতিদিনই মনে করি স্টোর রুমটা পরিস্কার করাবো কাউকে দিয়ে কারণ আমি ইদুর খুব ভয় পাই। আমার এই সমস্যার বিশেষত্য কি জানেন?
–  কি?
– আমার অই দুনিয়ায় এই দুনিয়াএ কোনো কথা মনে থাকেনা৷
– কিন্তু এই দুনিয়ায় সব মনে থাকে?
– জ্বী স্যার, এই জিনিসটা প্রথম কবে হয় তা আমার মনে নেই। ঘুম থেকে উঠলেই আমি এখন অই দুনিয়ায় চলে যাই৷ যেখানে আমার এই দুনিয়ার কিছু মনে থাকেনা৷
– সেখানেও তুমি ঘুমিয়ে পরলে এই দুনিয়ায় চলে আস?
– জ্বী, স্যার৷
– তোমার অই দুনিয়ার বর্ণনাটা দাও।
– স্যার সেই দুনিয়াতেও আমি একজন দুঃখী তবে একা নই৷ সেই দুনিয়াতে আমার একজন প্রেমিকা আছে। যার নাম দিয়া। সেই দুনিয়ায় আমি শুধু তার সাথে ব্যায় করা সময়টুকু উপভোগ করি এছাড়া আমার বাড়িতে আমার প্যারালাইজড মা থাকেন। যার দেখাশোনার জন্য একজন কাজের মেয়ে আছে যার নাম রামি। আমার বাবা থাকেন। তবে আমি বাড়িতে কারো সাথে কথা বলি না৷ আমার মতে বাবা এবং ওই কাজের মেয়ের মধ্যে কোনো সম্পর্ক আছে৷
– আচ্ছা। সম্পর্ক আছে সেটা জানতে পেরেছ  কিভাবে?
– স্যার, আমাদের স্টোর রুমে মাঝে মাঝেই তাদের একসাথে দেখা যায়৷
– তাদের মধ্যে কথোপকথন শুনেছ কখনো?
– জ্বী। আমি যতবারই সেখানে যাই ততবারই রামি আর্তনাদের সুরে বলতে থাকে “আমি ব্যাথা পাবো, অনেক ব্যাথা।”
– বুঝলাম। তোমার একজন বান্ধবী আছে। কি নাম বললে?
– দিয়া।
– আচ্ছা, তার সাথে তোমার কাটানো বেশীর ভাগ সময় কোথায় অতিবাহিত হয়?
– স্যার, নিকুঞ্জের ভিতর এক জঙ্গল টাইপ জায়গায়। মানুষ খুব কম যায় সেখানে আমরা সেখানে বসে শুধু কথাই বলি। ভুল বললাম। ও শুধু কথাই বলে।
– তুমি বলো না?
– খুব কম।
– আচ্ছা, আর কিছু বলতে চাও৷
– স্যার, ওই দুনিয়ায় আমি একজন ড্রাগ এডিক্ট।
– তাই নাকি?
– জ্বী, স্যার।
– কার থেকে ড্রাগ নাও?
– স্যার আমার একজন বন্ধু আছে সেখানে। যার নাম নাফি৷
– সে কি করে?
– স্যার, অই দুনিয়াতেও আমি একটি হাসপাতালের একাউন্টেন্ট। সেখানেই সে এসেছিল তার মেয়েকে ডাক্তার দেখাতে।
– বুঝলাম। তোমার এই সমস্যা কতদিন?
– স্যার, প্রায় দেড় বছর।
– এতদিন পর কেনো তুমি চিকিৎসা করাতে চাও।
– স্যার, আমি এই দুনিয়ায় একা কিন্তু ওই দুনিয়াতে আমি দিয়াকে পাই। সেজন্য।
– এখন কেন চিকিৎসা চাও?
– কারণ স্যার আমি দিয়াকে এই জীবনেও চাই।
– তোমার কি একবারের জন্য মনে হয়না এটি স্বপ্ন?
– জ্বী না স্যার। স্বপ্ন কখনো সময় মেনে চলে না৷ স্বপ্ন কিভাবে শুরু হয় কেউ জানে না৷ স্যার আমি যদি আজকে ঘুমাই তাহলে ওই দুনিয়ায় যা হবে পরেরবার ওই দুনিয়াতে সেই একই জিনিস হবে না বরং স্বাভাবিকভাবে যাবে৷ ধরুন আজকে বাবা বলবে মায়ের জন্য ঔষধ নিয়ে আসতে। পরের দিন না আনলে আমাকে বকা দিবে। স্বপ্ন কখনো এরকম হয় না স্যার।
–  আচ্ছা তুমি আজ এসো। তোমার সাথে আরো কথা বলতে হবে৷ তুমি শেষ ঘুমিয়েছিলে কবে?
– কালকে রাতে।
– আচ্ছা, তুমি নেক্সট ঘুমের পর আবার আসবে।
– জ্বী৷
– আর একটা কাজ। তুমি স্বপ্নে যাদের দেখেছ? তাদের স্কেচ তৈরী করতে পারবে? মানে তুমি বলবে। আর আমার ছেলে আকবে।
– জ্বী, স্যার পারবো।
– আর সাথে তাদের পুরো নাম।
– জ্বী, স্যার বলতে পারবো। দিয়ার পুরো নাম রাফিয়া চৌধুরী দিয়া। নাফির পুরো নাম নাফি খন্দকার।
– ঠিক আছে।
 – জ্বী, স্যার উঠি। স্লামালাইকুম।
– ওয়ালাইকুম।
রফিক জামান সাহেব শেষবারের মত স্পর্শের দিকে তাকালো। ছেলেটার হাটা চলায় কিছু জিনিস উপলব্ধি করা যায়৷ সে একদিকে বেকে হাটে অর্থাৎ তার ব্রেইনের বা দিকের কমান্ড পেতে অসুবিধা হয়। সে তার ছেলের রুমে যাচ্ছে।
তিনি একটি নোট বের করলেন।
তিনটি নাম লিখলেন৷ দিয়া, নাফি, রামি। এইতিনজনের নাম ছাড়া সে কারো নাম ঘটনায় নেই নি। এই তিনজনের পর্যাপ্ত তথ্য জানতে হবে৷ এই তিন নামের কেউ আছে নাকি তা বের করতে হবে। রফিক জামান ফোন দিলেন তার এক বন্ধুকে। যিনি ডিসি৷ তাকে পরের দিন তিনটি নামসহ তাদের স্কেচ পাঠিয়ে দেওয়া হলো
রফিক জামান কে তার বন্ধু কিছুদিন পর সব তথ্য নিয়ে আসতে বললো৷
স্পর্শ তার ওজন মাপলো। সাতাশ কেজি। আগেও তাই ছিলো। সে খানিকটা সস্তি পেলো। রাত বারোটা বাজে। সে বাসায় যাচ্ছে না। গত কয়েকদিন ধরেই তার বাসায় যাওয়া হচ্ছে না। গন্ধ টা তীব্র থেকে তীব্রই হচ্ছে। কোনও কাজ ছাড়া বাসায় বসে থাকাটাও ধৈর্য কে হার মানাচ্ছে। স্পর্শ কিছুদিন ধরে ভাবছে রফিক জামান এর বাসায় যাবে। কিন্তু তিনি তো বলে দিয়েছিল পরবর্তী ঘুমের পর তার সাথে দেখা করতে। কিন্তু এমনিতে দেখা করতে তো সমস্যা নেই। তার বাসায় যেয়ে যদি স্পর্শ বলে -” আমাকে কি এক প্লেট পান্তা ভাত দেওয়া যাবে?”  তাহলে কি তারা রাগ করবে।নিশ্চয়ই রাগ করবে।
স্পর্শ তার বাসার দিকে হাটা শুরু করলো। বিচ্ছিন্ন নগরে অবিচ্ছন্নভাবে হাটার সময় একমাত্র সাথী হয়ে থাকে স্মৃতি কিন্তু তার স্মৃতিচারণ এর মত কোনো কিছুই নেই তবে উপভোগ করার মতো আছে। রাস্তার ধারে একটা আইস্ক্রিম এর দোকানে সেখানে একটা গান বাজছে। সেই গান উপভোগ করা যায়। গানের কথাগুলো খুবই সুন্দর।
                                ” আজকে দেখি হিংসা-মদের মত্ত-বারণ-রণে
                                  জাগছে শুধু মৃণাল-কাটা আমার কমল-বনে”
সে যদি দিয়াকে আবার ফিরে পায় তবে কি সে তাকে নিয়ে এরকম গান শোনা অবস্থায় আইস্ক্রিম খেতে পারবে নাকি তখনো তার সমস্যা হবে। তখনও কি সে সব কিছুতে পোড়া চামড়ার গন্ধ পাবে।
রফিক জামান সাহেব তার বন্ধুর সামনে বসে আছেন। খুব বিরক্তির সাথে একটা কন্সটেবল এক কাপ চা আর বিস্কুট দিয়ে গেলো। তার চেহারা দেখে মনে হচ্ছে রাগে সে চা’তে থু থু দিয়েছে।
চা টা এখন আর খেতে ইচ্ছে করছে না।
– রফিক বল কোন প্রশ্নের উত্তর আগে জানতে চাস ? দশ দিনে লেগেছে সব বের করতে।
– প্রথমে বল দিয়া সম্পর্কে।
– হুম, একজন ফার্মাসিস্ট। একটি ঔষধ কোম্পানিতে চাকরি করে। প্রায় দেড় বছর আগে নিকুঞ্জে তার লাশ পাওয়া যায়। একটি গাড়ীতে।
– কোথায় ?
– নিকুঞ্জে। তোর হাতের নিচের ফাইলটাতে ওর গাড়ীর ডিটেলস দেওয়া আছে।
– ডেড বডির পোস্ট মোডেম এর রিপোর্ট ?
– সেটাও আছে। রেইপড কেস।
– হুম। আর রামি ?
– রামি খালেদ। মুগদা থাকে স্বামীর সাথে। স্বামীর আগের স্ত্রী মারা যাওইয়ার পর তার সাথে বিয়ে হয়।
– ভদ্রলোকের নাম ?
– আশফাক খালিদ। বিজনেস ম্যান। বনানীতে থাকতেন তার আগের স্ত্রী এবং ছেলের সাথে। ছেলে এখন একা বনানীতে থাকে।
– আমি কিন্তু এত কিছু জানতে বলি নাই।
– জানি এবং আমি তোকেও চিনি।
– হা হা। লাস্ট ওয়ান। নাফি।
– তার সম্পর্কে বেশী কিছু জানতে পারিনি। দুই বছর আগে ড্রাগ ডিলার হিসেবে তার নামে ওয়ারেন্ট বের হয়েছিল এখনও সে নিখোঁজ।
– আচ্ছা, ঠিক আছে৷
– চলে যাচ্ছিস? চা খাবি না?
– আ আ না থাক। পরে আসবো। থানায় বসে চা খেতে খেতে দুই বন্ধুর আড্ডা দেওয়াটা বেমানান৷
– ওমা, আচ্ছা যা। আসিস।
রফিক জামান সাহেব হালকা সুস্থির নিশ্বাস ফেললেন৷ অঙ্ক এখনো মিলেনি তবে অঙ্কের সুত্র তিনি বের করে ফেলেছেন৷
পনেরো দিন পরে রফিক সাহেবের সামনে স্পর্শ বসে আছে৷ তাকে আগের মতোই শুকনা লাগছে।
– স্পর্শ তুমি কালকে ঘুমিয়েছ?
– জ্বী না স্যার।
– তাহলে?
– স্যার, আমার খুব ক্ষুধা লেগেছে৷ আমাকে পান্তা ভাত খেতে দিবেন?
– হুম, তুমি এসেছ শুনেই আমি পান্তা রেডি করতে বলেছি৷ তুমি যেহেতু কিছু খাও না।
– ধন্যবাদ স্যার। আমি কি একটু পানি খেতে পারি৷
– জ্বী, তোমার সামনেই পানি৷
– ধন্যবাদ।
– স্পর্শ, তোমার সাথে কখনো এমনটা ঘটেছে? ধরো, তুমি অঙ্ক পরীক্ষা দিচ্ছ৷ একটা অঙ্ক তুমি জানো কিভাবে করতে হয় কিন্তু সূত্র ভুলে গেছো। তখন তুমি তোমার সামনে বসে পরীক্ষা দেওয়া ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করলে, সে তোমাকে সূত্রটি বলে দিলো এরপর তুমি অঙ্কটি পারলে৷
– জ্বী, স্যার। এমন হয়েছে৷
– আমিও এখন তোমাকে শুধু সূত্র বলে দিবো৷ অঙ্ক তুমি নিজে কষবে।
– জ্বী, স্যার।
– প্রথমত তোমার ইনসমিয়ার সমস্যা। প্রথমে ভেবেছিলাম একাকিত্ব থেকে এমন হয়েছে। কিন্তু আমি ভুল ছিলাম। তুমি ড্রাগ এডিক্ট এই জীবনেও ছিলে। যার কারণে তোমার ব্রেইনের বাম পাশ ভালোমতো কমান্ড দিতে পারে না একারণে তুমি বাম পা স্বাভাবিকভাবে ফেলতে পারো না। কিছু ড্রাগ আছে। টেবলেট টাইপ যা ইন্দোনেশিয়াতে তৈরী করা হয়। একটা খেলেই অনেক সমস্যা হয়৷ আমার যতদূর মনে হয় তুমি একসাথে অনেকগুলি খেয়েছ যার ফলে তোমার স্মৃতিশক্তি বাস্তবতার থেকে তোমার কল্পনার জগতটাকে বেশী করে আকড়ে ধরে৷
– মানে স্যার?
– তুমি ঘুমালে যা দেখো তা পুরোটাই তোমার কল্পনার অংশ।
– ঘুমে মানুষ স্বপ্ন দেখে। কল্পনা ঘুমে করা যায় না৷
– হুম, সেই টেবলেট তোমাকে মানষিকভাবে বিপর্যস্ত করেছে। তুমি যা দেখো তা সম্পূর্ণ জাগ্রত অবস্থাতেই দেখো কিন্তু তোমার মনে হয় তুমি ঘুমাচ্ছ৷ শুনো তোমার ওই দুনিয়ায় তোমার নিজেস্ব কোনো গাড়ি আছে?
– জ্বী আছে।
– গাড়ীর নাম্বার কত?
– ২৭৯০৫০
– হুম, দিয়া এই দুনিয়াতেও আছে।
– কোথায় স্যার?
– সে মারা গেছে। তার ধর্ষিত ডেড বডি দেড় বছর আগে পাওয়া গিয়েছিল ২৭৯০৫০ নম্বর গাড়িতে।
– মানেহ!
– হুম, তোমার বাবার সাথেও আমার কথা হয়েছিল। তোমার মা মারা যাওয়ার পর তোমার বাবা কম বয়স্ক একটি মেয়েকে বিয়ে করে। যার নাম রামি৷ তোমরা একসাথে থাকতে তবে তুমি ড্রাগের পিছনে নিজের টাকা নষ্ট করার পর তোমার বাবার কাছে যেতে একদিন তিনি টাকা না দিতে চাইলে তুমি তাকে এবং রামিকে নিয়ে বাজে বাজে কথা বল যা শুনে তিনি বাড়িতে তোমাকে একা রেখে চলে যান। আর দেখা করেন নি৷ আমি আর কিছু বলতে চাচ্ছি না। শুধু বলতে চাচ্ছি তোমাকে তোমার বাবা এখনো অনেক ভালোবাসে৷ তুমি চাইলে তার কাছে ফিরে যেতে পারো।
– স্যার, আমি আসি৷
– পান্তা খাবে না?
– না স্যার।
স্পর্শ রফিক জামানের বাসা থেকে বের হয়ে হাটতে লাগলো। অসম্ভব হলেও সত্য তার এখন মনে পরছে আগের সব কথা মনে পরছে৷
দেড় বছর আগে
স্পর্শ বাবা ব্যাগ গোছাচ্ছে। স্পর্শ চিৎকার করে বলছে-
” কোথায় যাচ্ছ বাবা? আমাকে টাকা না দিয়ে চলে যাবে? কোথায় যাবে? তোমার আর নতুন মায়ের কি রোমান্স করতে অসুবিধা হচ্ছে? আমাকের টাকা দাও আমি এখনি চলে যাবো এরপর তোমরা যা ইচ্ছে করো। যত স্টাইলের রোমান্স জানো সব করো।”
স্পর্শের বাবা কোনো কথা না শুনেই বাসা থেকে তার স্ত্রীকে নিয়ে বের হয়ে যায়। তবে যাওয়ার আগে খাবার টেবিলের উপর পনেরো হাজার টাকা রেখে যায়। স্পর্শ সেই টাকা নিয়ে বের হয়ে যায়। তার টাকা নিয়ে চলে যায় নাফির বাসার সামনে।
– কিরে, টাকা আছে?
– এই নে।
– হুম, এই যে টেবলেট মুখে দিয়ে রাখ।
– আচ্ছা, যাই।
– কই যাস?
– দিয়া অপেক্ষা করছে।
– গাড়ী চালাতে পারবি না। চল আমি নামিয়ে দিয়ে আসি।
গাড়িতে উঠার সাথে সাথেই স্পর্শের রিয়াকশন শুরু হলো। সে কোনোভাবেই নিজেকে আর স্থির রাখতে পারলো না। নাফি সেই সময় দেখতে পেলো নিকুঞ্জের সেই গাছতলায় দিয়া দাড়িয়ে আছে। স্পর্শ সে সময় সম্পূর্ণভাবে নেশার জগতে। নাফি গাড়ি থেকে নামতেই দিয়া গাড়ির কাছে এলো। দিয়া স্পর্শকে দেখতে পেয়েই কিছু বলতে যাচ্ছিলো। নাফি তখনই দিয়ার মুখ চেপে ধরে গাড়ির পিছনে ঢুকালো। একে একে তার সব জামা খুলে ফেললো৷ সেদিন দিয়ার চিৎকার কেউ শুনতে পায় নি। এমনকি সামনের সিটে বসে থাকা স্পর্শও। নাফি দিয়ার বডি পিছনের সিটে রেখে সামনে ড্রাইভিং সিটে বসলো।  স্পর্শের দিকের তাকালো এবং বুঝতে পারলো তাকে এখন রোবটের মত ব্যবহার করা যাবে৷ নাফি তাকে গাড়ি থেকে বের করলো এবং কানে কানে বললো- ” এই নে ছুরি যা তোর জীবনের কালো অধ্যায় মুঝে ফেল।” নাফি একটা সিগারেট ধরালো এবং পেছনে শুনতে পেলো ছুরিকাঘাতের শব্দ সাথে একটা মেয়ের আর্তনাদ। স্পর্শ তার কাজ শেষ করে গাড়ির বাইরে দাড়িয়ে আছে। নাফি গাড়িটা সেখানে ডেড বডিসহ রেখে যাওয়ায় কথা ভাবলো কারণ গাড়িটা নাফিই ধান্দা করে স্পর্শকে কিনে দিয়েছিল। পুলিশ গাড়ির সিরিয়াল নাম্বারের সাহায্যে কিচ্ছু বের করতে পারবে না৷
সেদিন নাফি কোনোভাবে স্পর্শকে বাসায় দিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এরপর তাকে তিনদিন খুজে পাওয়া যায়নি। তিনদিন পর স্পর্শ তাকে পায় এবং ধরে নিয়ে এসে বন্দী করে রাখে তার বাসার স্টোর রুমে। তার সেই ছুরি দিয়েই সে খুন করে নাফির বাচ্চা এবং স্ত্রীকে। নাফি তা জানত না। সে স্টোর রুমেই পরেছিল। একদিন বন্দী করে রাখার পর স্পর্শ নাফির সাথে দেখা করতে যায়। একটুকরা ফ্রাই নিয়ে। নাফি মুরগির ছানার রান মনে করে সেই ফ্রাই খায় এবং সেই সময় স্পর্শ একটা অডিও রেকর্ড চালু করে যেখানে নাফির বাচ্চার অর্তনাদের সুরে বলতে থাকে- “আমি ব্যাথা পাবো, অনেক ব্যাথা।” নাফি খাওয়া থামিয়ে স্পর্শের দিকে তাকিয়ে থাকে। স্পর্শ তখন বলে উঠে- “নিজের বাচ্চার বুড়ো আঙুলের ফ্রাই খেতে কেমন লাগছে, নাফি?
নাফি স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে থাকে৷ স্পর্শ আবারো বলে উঠে – ” নাফি, তুমি যা করেছো তার প্রাপ্য শাস্তি আমি তোমাকে দিতে পারিনি৷ তুমি নিজেই বলেছিলে ওই টেবলেট এক সাথে তিনটা খেলে মানুষিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পরবে। আমি এখন তোমার মুখ হাত বেধে দিবো এরপর বের হয়ে ছয়টা টেবলেট খাবো। You deserve to play cards with your family in hell.
স্পর্শ সেইদিনই পুলিশের কাছে সব খুলে বলে। পুলিশ তাকে নাফির ডেড বডির কথা জিজ্ঞেস করলে সে বলে -“আমার বাসার স্টোর রুমেই আছে৷ দয়া করে ভালো কাউকে পাঠাবেন। প্রায় দেড় বছর পুরনো লাশ। গন্ধ সহ্য না করতে পেরে জ্ঞান হারাতে পারে।”
জেলের জীবনটা তার সুখী মানুষ হিসেবেই গেছে। সে এখন খাবার খেতে পারে কোনো পোড়া চামড়ার গন্ধ পায় না। জেলে বসে সে রফিক জামানকে চিঠি লিখে। চিঠির ধরণ হলো -” স্যার,
আমি খাবারে মানুষের মাংস পোড়া গন্ধ পেতাম কারণ নাফির বাচ্চার বুড়ো আঙুল কেটে সেটার ফ্রাই করেছিলাম আমি নিজে।”
একদিন পুলিশ তার জেলরুমের সব দেয়ালে “দিয়া” লিখা খেয়াল করলো। পরবর্তীতে তাকে মানুষিক চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয়৷
অসম্ভব হলেও সত্য স্পর্শর ফাঁসী হয় না। ১৫২ ধারা অনুযায়ী মানুষিক রোগী হলে সেই অপরাধীর ফাঁসী হয় না। চিকিৎসা হয়৷ সুস্থ হলে বেকাসুর খালাস দেওয়া হয়৷
রফিক জামান তার বাড়ির বাইরে দাড়িয়ে চিঠি দেখছে৷ হঠাৎ স্পর্শের একটা চিঠি পেল। যাতে লিখা -” স্যার, সেই টেবলেট টা খেলে কি আমি কল্পনার জগতের মাধ্যমে দিয়াকে ফিরে পাবো?”
সেই সময় রফিক জামান হর্নের আওয়াজ পায়। সামনে তাকিয়ে দেখে একটি গাড়ি৷ সিরিয়াল নাম্বার ২৭৯০৫০। ড্রাভিং সিটে বসে আছে স্পর্শ যার মুখে হাসি। সেই হাসির অঙ্ক মেলানো হয়ত সহজ কিন্তু সূত্র মনে রাখা অনেক কঠিন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here