শেষ বিকেলের আলো-পর্ব – ২

0
802
bangla golpo love

মায়া পানি খাওয়ার জন্য নিজ রুম থেকে বের হলো। রুম থেকে বের হয়েই আগে বসার রুমের দিকে তাকালো। মায়ার রুম  থেকে বের হলেই পুরো বসার রুমটা দেখা যায়। পুরো বসার রুমে চোখ বুলিয়েও কাব্যকে দেখতে ফেলো না। মনটা খারাপ করে আবার নিজ রুমে চলে গেলো মায়া। আসলে পানির পিপাসা লাগে নেয় মায়ার! কাব্যকে এক নজর দেখবে বলেই পানির উসুলা দিয়ে বের হয়ে ছিলো রুম থেকে। বসার রুম আর খাবার রুম এক সাথে। পানি খাওয়ার জন্য টেবিলের সামনে গেলেই কাব্যকে দেখতে পেতো! কিন্তু তা আর হলো না। কাব্য মনে হয় চলে গেছে।
মায়া কিছু ক্ষন বারান্দায় থাকা গাছ গুলোতে পানি দিয়ে রুম থেকে বের হয়ে রান্না ঘরের দিকে গেলো।
রান্না ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে মায়া। মিসেস রাবেয়া বেগমকে কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারছে না।
“কিরে কিছু বলবি?”
রাবেয়ার কথায় চমকে উঠলো মায়া। মায়া দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কিছু একটা নিয়ে গভীর ভাবে চিন্তিত। মায়া যে কিছু একটা নিয়ে চিন্তিত সেটা রাবেয়া ঠিকই বুঝতে পেরেছে। তাই আবার বলল, “কি হয়েছে তোর? কি নিয়ে চিন্তা করছিস তুই?”
” আসলে একটা কথা জানার ছিলো!”
” কি কথা?”
মায়া চুপ করে গেলো। জিজ্ঞেস করবে না কি, না করবে তা নিয়ে দ্বিধার মধ্যে আছে মায়া। আবার জিজ্ঞেস করলেও রাবেয়া কি মনে করে তাও ভাবসে মায়া। মায়াকে এবারও কিছু না বলতে দেখে রাবেয়া মায়ার সামনে এসে মায়ার কাঁধে হাত রেখে বলল, “তুই নিজেও জানিসে তুই আমাকে সব বলতে পারিস।”
“হ্যাঁ জানি আমি।”
“তাহলে এতো ভাবসিস কেনো?”
মায়া একটা বড় নিঃশ্বাস নিয়ে বলল, “কাব্য চলে গেছে?”
“হুম। কিছু ক্ষন আগে।”
রাবেয়া উত্তরটা দিতেই মায়া রান্না ঘর থেকে চলে যেতে নেয়। তখনি রাবেয়া পিছন থেকে বলল, “যে টা জানতে চেয়েছিস সে টা না জিজ্ঞেস করেই চলে যাচ্ছিস যে?”
রাবেয়ার কথা শুনে মায়া দাঁড়িয়ে গেলো। মায়া পিছনে ফিরে বলল, “কই আর কিছুই তো জানার ছিলো না!”
“দেখ মায়া যদি এই প্রশ্নটাই করার ছিলো তাহলে এতো ভাবতি না প্রশ্নটা করার আগে।”
কথাটা বলে একটা হাসি দিলো রাবেয়া মায়ার দিকে তাকিয়ে। মায়া কথাটা এড়িয়ে গিয়ে বলল, “তোমার কাছে আমার সব কিছুই অন্য রকম লাগে। আমি যা ভাবি তুমি সব সময় উল্টো টা মনে করো!”
কথাটা বলেই মায়া নিজের রুমে চলে গেলো। মায়া রুমে এসে একটা নিঃশ্বাস নিয়ে বিছানায় বসে পরলো। আসলে মায়া কাব্যের সম্পর্কে জানতে চেয়ে ছিলো। কাব্য কেমন? কাব্য কেনো ওকে দেখলে বিরক্ত হয়? এই সবই জানতে চেয়েছে। কিন্তু তা আর জানা হলো না।
মায়া বারান্দায় গিয়ে বাহিরে দিকে কতক্ষন তাকিয়ে থেকে মনে মনে ঠিক করলো যে ভাবেই হক কাব্যের সম্পর্কে জানবেই জানবে।
কাব্য বাসায় এসেই আগে গোসল করে নিলো। তারপর নিজ হাতে এক মগ কফি বানিয়ে বারান্দায় গিয়ে বসলো। কফি বানানোর সময় মিসেস রোজি অনেক বার বলেছে এখন দুপুরে ভাত না খেয়ে কফি খাবি না। কিন্তু কাব্য তা কানেও নেয় নেই। রোজি ছেলের উপর অনেক বেশি ক্ষিপ্ত ছেলের কাজ কর্মের জন্য।
কাব্য বারান্দায় চেয়ারে বসে কফির মগে চুমুক দিচ্ছে আর ভাবছে একটা মানুষের সাথে আরেকটা মানুষের এত মিল কি ভাবে থাকতে পারে? ফিজিক্যালি তো কোনো মিল নেই! তাহলে মনের এতো মিল কি করে হয়? অনেক ভাবাচ্ছে কাব্যকে মায়ার পছন্দ গুলো। কাব্য মায়াকে সহ্য করতে পারে না যে তা না। কিন্তু মায়ার নামটাই কাব্যের জন্য মায়াকে অসহ্য করার কারণ।
কাব্য এই সব ভাবতে ভাবতে কফিটা শেষ করে চেয়ারের পাশে মগটা রেখে চোখটা বন্ধ করে আছে। কাঁধে কারো হাতের স্পর্শ পেয়ে চোখ খুলে থাকালো মানুষটার দিকে। কাব্য মানুষটাকে দেখতেই বসা থেকে উঠে জড়িয়ে ধরে কেঁদে দিলো।
আরাব কাব্যের পিঠে হাত বুলাতে লাগলো। আরাবেরও অনেক কান্না পাচ্ছে। কিন্তু সে কাঁদবে না। সে কাঁদলে যে কাব্য আরো বেশি ভেঙ্গে পরবে। আর সে চায় না কাব্য ভেঙ্গে পরুক। আরাব কড়া গলায় বলল, “এত দিন হয়ে গেলো দেশে আসছো অথচ আমাদের সাথে দেখা করারও সময় পায়ও নেয়। অথচ এখন আসাতে কান্না করছো যেনো কিছু না বলি!”
আরাব কথা গুলো বলেও লাব হলো না। কাব্যের কান্না বন্ধ হলো না। উল্টো আরো বেড়েছে। আরাবও আর কিছু বলল না। কাঁদতে দিলো কাব্যকে। যত কাঁদবে তত মন হালকা হবে। আজ চার বছরের কষ্ট মনে বাক্স বন্ধ করে রেখেছে। আজকে অন্তত কেঁদে মনটাকে একটু হলেও হালকা করুক।
প্রায় অনেক ক্ষন আরাবকে ধরে কান্না করেছে কাব্য। একটু স্বাভাবিক হতেই আরাবকে ছেড়ে ফ্রেশ হতে চলে গেলো কাব্য।
বিকেলে কাব্য আর আরাব দু’জনে ছাদে দাঁড়িয়ে শেষ বিকেলের আলো দেখছে। তারা দু’জন চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। সেই আধ ঘন্টা ধরে দাঁড়িয়ে আছে অথচ কারো মুখে কোনো কথ নেয়। আরো কিছু ক্ষন চুপ থেকে আরাব বলল, “চার বছর হয়ে পাঁচ বছর হতে চলেছে। আর কত একা থাকবে তুমি কাব্য?”
আরাবের কথা শুনেও কিছু বলল না কাব্য। চুপ করে আছে। কাব্য খুব ভালো করে জানে আরাবকে এই সব কে বলতে বলেছে। এটা তার মায়ের কাজ যে সে টা কাব্য খুব জানে। আরাবও খুব ভালো করে জানে কাব্য তার কথার জবাব দিবে না। তাই জবাবের অপেক্ষা না করে আরাব বলা শুরু করলো, “দেখো কাব্য তোমাকে এই ভাবে দেখে আন্টি আঙ্কেল আর থাকতে পারছে না। কি ভাবেও বা পারবে! নিজেদের চোখের সামনে নিজেদের ছেলেকে এই ভাবে দেখতে কারই বা ভালো লাগে বলো তুমি? আর তোমার বয়সও তো কম হলো না। নিজের কথা না ভাবলে না ভাবো, কিন্তু তাদের কথা তো একবার ভাবো। নিজের জন্য না হলেও তাদের জন্য হলেও অন্তত বিয়েটা করো। তারা কি চায়? তোমাকে সুখী দেখতে চাই। ব্যাস এইটুকুই তো ইচ্ছা তাদের। এই ইচ্ছে টা তো পূরণ করতেই পারো তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে।”
কথা গুলো ঠান্ডা গলায় বলল আরাব। কাব্যও ঠান্ডা গলায় বলল, “আমি তাকে কথা দিয়ে ছিলাম সে ছাড়া আর কোনো মেয়ে আমার জীবনে আসবে না। সেই প্রথম সেই শেষ! আমি থাকে ছাড়া আর কাউকে নিজের জীবন সঙ্গী হিসেবে মেনে নিতে পারবো না। আমি পারবো না আমার দেওয়া কথা ভাঙ্গতে।”
“কাব্য সে যদি জানতো ভবিষ্যতে এই রকম কিছু হবে তাহলে সে কখনোই তোমাকে এই রকম কথা প্রমিজ হিসেবে বলতে দিতো না।”
“দেখো ভাইয়া প্রেম একবারই লাইফে আসে। আর সে টা আমার লাইফে সাড়ে পাঁচ বছর আগে এসেছে। এখন আর আমার লাইফে প্রেম আসবে না।”
“আমি কি দেখবো কাব্য? তুমি দেখো প্রেম এক বার না আল্লাহ চাইলে তিন চার বারও প্রেম হয়। তুমি দেখবে তোমার লাইফেও এমন কিছু হবে।”
আরাবের কথা শুনে কাব্য তাচ্ছিল্য হাসি দিয়ে বলল,
“আসলে আসবে! কিন্তু আমার প্রথম এবং শেষ ভালোবাসা শুধু একজনই। আর সে একজন কোন এক জন সে টা আশা করি বলতে হবে না।”
“মা……”
আরাব কিছু বলতে যাবে তখনি চোখ পরলো ছাদে দাঁড়িয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকা মেয়েটার দিকে। কাব্য আরাবের কোনো কথা না শুনতে পেয়ে আরাবের দিকে তাকায়। কাব্য আরাবের দিকে তাকাতেই দেখে আরাব তার পিছনের দিকে তাকিয়ে আছে। আরাবের চোখ অনুসরণ করে পিছনে তাকাতেই দেখে মায়া দাড়িয়ে আছে। কাব্যের তাকানো দেখে সামনের দিকে এগিয়ে আসলো মায়া। এগিয়ে এসে নিজের থেকেই বলল, “স্যরি আমি জানতাম না আপনে এখানে। জানলে আরো পরে আসতাম। আসলে এই শেষ বিকেলের আলো টা না আমার অনেক বেশি ভালো লাগে তাই আসা।”
মায়ার কথা শুনে এবারও রীতিমতো চমকে উঠলো কাব্য। কাব্য আর এক সেকেন্ডও না দাঁড়িয়ে ছাদ থেকে নিচে নেমে গেলো।
আরাব আর মায়া দু’জনই কাব্যের যাওয়ার দিকে চেয়ে রইলো। কাব্যের যাওয়া মায়া বুঝলেও আরাব বুঝে উঠতে পারে নেয়। মায়া আরাবের চাহনি দেখে বুঝতে পারলো কাব্যের এই ভাবে চলে যাওয়ার কারণ আরাব বুঝতে পারে নেই। মায়া একটা হাসি দিয়ে আরাবকে উদ্দেশ্য করে বলল, “তার এই ভাবে চলে যাওয়ার কারণ আমি!”
মায়ার কথা শুনে আরাব মায়ার দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকালো। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে আরাব বলল, “আপনে মানে..??”
মায়া একটা হাসি দিয়ে বলল, “আমি মানে আমি! কিন্তু আমি কেনো তার বিরক্তির কারণ সে টা আমি নিজেও জানি না।”
আরাবের মাথা ঘুরাচ্ছে। মায়ার কথার আগা মাথা কিচ্ছু বুঝতে পারছে না আরাব। এই মেয়ের জন্য কেনো কাব্য চলে যাবে? এমন কি হয়েছে যে এই মেয়ে কাব্যের বিরক্তির কারণ? নানা রকম প্রশ্ন আরাবের মাথায় বরফের মতো জমে আছে।
মায়া আরাবের কোনো কথা না শুনতে পেয়ে আরাবের দিকে তাকালো। আরাব মায়ার দিকে এখনো ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে। আরাবের কাছেও মায়াকে এখন বিরক্ত লাগছে। চিনা নেয়, জানা নেয় কোথা থেকে এসে এই সব বলা শুরু করলো। হয়তো, এই মেয়ের এই সব অতিরিক্ত কথার জন্যই কাব্যের কাছে এই মেয়েকে বিরক্তিকর লাগে। মায়া একটা হাসি দিয়ে আবার বলল, “ও আপনে তো আমাকে চিনেন না। আমি মায়া! এই বিল্ডিংয়ের চার তলায় থাকি। কাব্যদের উপরের বাসায়।”
” মায়া….!”
চলবে….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here