শেষ বিকেলের আলো || পর্ব- ১

0
260
rajkumari golpo

সেই কখন থেকে বেলটা বেজে যাচ্ছে তো যাচ্ছেই। বাসায় কেউ নাই নাকি? আর এতো সকালেই বা কে এলো— খুব বিরক্তি নিয়ে ঘুম থেকে উঠে দরজা খুলতে খুলতে বলল মায়া।
দরজাটা খুলেই একটা হাই তুলে সামনে তাকাতে মায়ার চোখ গুলো ছানাবড়ার মতো বড় বড় হয়ে গেলো। মায়ার মুখ পুরো হা হয়ে আছে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে হাসিতে ফেটে পড়লো মায়া।

মায়ার সামনে দাঁড়িয়ে আছে কাব্য। মায়ার হাসি দেখে খুবই বিরক্ত লাগছে তার। কাব্যের কাছে মনে হচ্ছে পৃথিবীর সব থেকে বাজে কিছু যদি থেকে থাকে তা হলো মায়ার হাসি।

কীরে মায়া, কে এলো— মিসেস রাবেয়া রান্নাঘর থেকে মেইন দরজার সামনে আসতে আসতে কথাটা বললেন। কিন্তু দরজার সামনে এসে কাব্যকে এই অবস্থায় দেখে আর পুরো বাক্য শেষ করতে পারলেন না। রাবেয়ারও অনেক হাসি পাচ্ছে কাব্যকে এভাবে দেখে। কিন্তু কাব্যের বিরক্তিকর চেহারা দেখে আর হাসলেন না। উল্টো মায়াকে এক ধমক দিয়ে বললেন, মায়া, কী, হচ্ছে কী? যা ভিতরে যা!

মায়া তবুও হাসি থামায় না। হাসি থামাবেই বা কী করে? এই অবস্থায় কাউকে দেখলে যে কারোই হাসি পাবে। মায়া হাসতে হাসতে ভিতরে চলে গেলো।

আরে বাবা তোমার তো দেখি পুরো শরীর কাদায় মেখেটেখে অবস্থা খারাপ। এই অবস্থা হলো কী করে? রাবেয়া অনেক কষ্টে হাসি চেপে কথাটা বললেন কাব্যকে।

কাব্য অনেক কষ্টে একটা হাসি দিয়ে বলল, আসলে আন্টি সকালে একটা কাজে বের হয়ে ছিলাম। আসার সময় গাড়িটা নষ্ট হয়ে যায় মাঝপথে। রাস্তার সাইডে সিএনজির জন্য দাঁড়িয়ে ছিলাম তখন একটা বাস সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় এই অবস্থা করে দিয়ে যায়। জানেনই তো ঢাকা শহরের রাস্তা কেমন! একটু বৃষ্টি না হতেই পানি জমে যায়। এই জন্যই আম্মুকে সব সময় বলি দেশের বাহিরেই ভালো। কে শোনে কার কথা।
কাব্য কথা গুলো বলতে বলতে বাসার ভেতরে ঢুকলো। এতগুলো কথা বলে ফেলেছে অথচ এটা এখনো বলেনি যে এই বাসায় কেনো এসেছে!
রাবেয়া কাব্যের কথা গুলো শুনে বলল, এই দেশটা কিন্তু খারাপ না কাব্য।
হ্যা আন্টি, তা তো দেখাই যাচ্ছে! যা হোক, আসলে আপনাদের কষ্ট দিতে চাইনি। আমার রাতে বাসায় ফেরার কথা ছিলো। কাজ তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেছে তাই চলে এসেছি। এখন এসে দেখি বাসায় তালা। আজকে আমি চাবি নিয়েও বের হইনি আর আম্মু আব্বুও বাসায় নেই। তারা দু’জন নাকি নানুর বাসায় গিয়েছে নানুকে দেখেতে। নানুর নাকি শরীরটা তেমন ভালো নেই। বাসার দরজায় তালা দেখে আম্মুকে ফোন দিলে আম্মু বলল তারা আসতে আসতে এখানে থাকার জন্য। তাই এসেছি আর কী!
খুব ভালো করেছো বাবা এসেছো। তুমি ছোট বেলায় কত আসতে এই বাসায়। আর এখন! এতো দিন হয়ে গেলো দেশে এসেছো। অথচ আজকে আমার বাসায় পা দিলে। বসো আমি তোমাকে লুঙ্গি আর টিশার্ট দিচ্ছি।
কথাটা বলে নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন রাবেয়া। লুঙ্গি আর টিশার্ট এনে কাব্যের হাতে দিয়ে আবার বললেন, আসলে একটা কথা তো বলতে ভুলেই গেছি। তুমি লুঙ্গি পরতে পারো তো? আসলে তোমার আঙ্কেলের প্যান্ট তোমার লাগবে না। তাই কষ্ট করে লুঙ্গি পড়তে হবে।
কাব্য হ্যা বা না কিছু না বলে শুধু একদৃষ্টিতে লুঙ্গিটার দিকে থেকে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল, পারি।
তাহলে তো ভালোই। আমি তো ভেবেছি তুমি দেশের বাহিরে থেকে এসেছো, লুঙ্গি পড়তে পারবে কি না।
রাবেয়ার কথাবার্তা কাব্যের কাছে এখন খুব বিরক্তিকর লাগছে। মনে মনে কাব্য তার মাকে যে কত কঠিন কঠিন কথা বলছে তার কোনো হিসাব নেই। কাব্য দাঁতে দাঁত চেপে বলল, আন্টি ওয়াশরুমটা কোন দিকে?
ও হ্যা, আমি তো ভুলেই গেছি। আসো বাবা আমার সাথে, আমি দেখিয়ে দিচ্ছি।
রাবেয়ার পেছনে পেছনে কাব্য ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে গেলো। রাবেয়া কাব্যকে ওয়াশরুম দেখিয়ে দিয়ে আবার রান্নাঘরে গিয়ে কাজে লেগে পড়লেন।
এতক্ষণ মায়া আড়াল থেকে সব কিছু দেখছিলো। মায়া যখনই কাব্যকে দেখে তখনই অন্য রাজ্যে চলে যায়। কিন্তু কাব্য মায়াকে দেখলে অনেক বেশি বিরক্ত হয়। এই নিয়ে পাঁচবার তাদের দেখা হয়েছে। প্রথম দিকে কাব্য খুব ভালোভাবে কথা বলতো মায়ার সাথে। যদিও কাব্য কারো সাথে এত বেশি কথা বলে না। কিন্তু যখন থেকে মায়ার নাম জেনেছে তখন থেকে কেনো যেন কাব্য তাকে সহ্য করতে পারে না। মায়া জিনিসটা খুব ভালো ভাবে বুঝতে পেরেছে যে কাব্য তাকে একদমই দেখতে পারে না।
কাব্য ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে এসে বসার ঘরে বসলো। সে এখন একদৃষ্টিতে লুঙ্গির দিকে তাকিয়ে আছে। এই লুঙ্গির সাথে কাব্যর অনেক মিষ্টি স্মৃতি জড়িয়ে আছে। দূর থেকে কাব্যের এই লুঙ্গি দেখার দৃশ্যটা খেয়াল করলো মায়া। মায়া কাব্যকে যতো দেখে তত বেশি চিন্তায় পড়ে যায়। কাব্য এমন কেনো? এটাই তার প্রধান চিন্তা।
রাবেয়া দুই মগ কফি নিয়ে এসে কাব্যের দিকে একটি মগ এগিয়ে দিলেন। কাব্য একটা মলিন হাসি দিয়ে মগটা নিলো।
রাবেয়া কাব্যের হাতে মগটা দিয়ে তার সামনের সোফায় বসে মায়াকে ডাকলেন।
মায়া ডাক শুনেই নিজের ঘরে চলে এল। মায়া এখন ডাক শুনেও না শোনার ভান ধরে আছে। অনেকবার ডাকার পর মায়া গায়ে একটা চাদর জড়িয়ে বসার ঘরে এলো। কাব্যের দিকে একবার তাকিয়ে রাবেয়ার পাশে বসে বলল, কী হয়েছে? এত ডাকছো কেনো?
রাবেয়া আরেকটা মগ মায়ার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, তোর কফি।
মায়া একটা হাসি দিয়ে রাবেয়ার হাত থেকে মগটা নিতে নিতে বলল, চিনি, দুধ বেশি করে দিয়েছো তো? তুমি কালকে একবার কফি দিয়েছো, ভালো হয়নি।
আহ্!
আহ্ শব্দ শুনে মায়া এবং মিসেস রাবেয়া বেগম দু’জনই কাব্যের দিকে তাকায়।
মায়ার কথা শোনে কাব্য চমকে উঠলো। মায়া যখন কথা বলছিলো তখন কাব্য গরম কফির মগে চুমুক দিচ্ছিলো। মায়ার কথার সাথে বেখেয়াল হয়ে মগে চুমুক দেয় যার ফলে সাথে সাথে ঠোঁট পুড়ে যায়।
মিসেস রাবেয়া বেগম কাব্যের কাছে এসে বলল, বাবা তেমন লাগেনি তো?
কাব্য নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, না আন্টি কিছু হয় নি।
মিসেস রাবেয়া বেগম অনেক বার জানতে চাইলেও কাব্যের উত্তর একটাই কিছু হয় নেয়।
মায়া শুধু কাব্যের দিকে এক নজর তাকালো। তারপর সেখান থেকে উঠে গেলো কফির মগ হাতে নিয়ে। মায়ার সামান্য এই কথা শোনে কাব্য কেনো চমকে উঠলো সেটাই ভাবসে মায়া। এই অল্প কয়েক দিনে মায়া খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছে কাব্যের ভিতরে কিছু একটা চলছে। কিন্তু কি চলছে সে টাই বুঝে উঠতে পারছে না মায়া। মাঝে মাঝে কাব্য মায়াকে এমন মুগ্ধ নয়নে দেখে, আবার মাঝে মাঝে অনেক অসহ্য ভাব নিয়ে তাকিয়ে থাকে। কাব্য কেনো এই রকম? কি কারণে তার সাথে এমন করে? কি কারণে তার কথায় মাঝে মাঝে কাব্য এই রকম চমকে উঠে? এই সব প্রশ্ন মায়ার মনে বাসা বেঁধেছে….
চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here