মেঘের অস্ত্র

ধ্রূব খান

0
180
nishiddho premer golpo

আজকাল প্রায়ই এমন হচ্ছে৷ বাসায় বউ যখন চিল্লাচিল্লি করে তখন বউকে যম মনে হয়। মনে হয় কোনোভাবে বাসা থেকে বের হতে পারলেই সুখের সাগরে ডুব দিতে পারবো। আগে এমনটা হতো না। আগে দেখা যেত বউ রেগে চিল্লাচিল্লি করার সময়েও ঘুমিয়ে যেতে পারতাম৷ খুব সহজে। এখন তা আর সম্ভব হয় না। অবাক করা হলেও তার চিল্লানোর কারণ গুলো খুবই অপ্রাসঙ্গিক। সেদিন যেমন রাগ করেছিল, ডিম কিনেছি সেই ডিমে মুরগীর বিষ্ঠা লাগানো ছিল। আমার কথা হলো ডিমটা একটু ভালো করে ধুলেই ত হয়। না তিনি চিৎকার করেই যাবেন।

– ডিম এর থেকে এখন মুরগীর বিষ্ঠা পরিস্কার করা লাগছে। কিছুদিন পর নিজের বিষ্ঠা পরিস্কার করতে বলবা।
সে আপন মনে এসকল বিষয়ক কথা বলেই যায়৷ আমার অবশ্য এতে ভাবান্তর হয় না৷ কিন্তু আজকাল এসব আর সহ্য করা যাচ্ছে না৷ কিছু বলতেও পারছিনা৷ মনে হয় অনেক ভালোবাসি৷ কেনই বা বাসবো না। যে মেয়ে বাসর ঘরে বর ঢুকার সাথে সাথে বলে উঠে। “আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি, কখনো আপনাকে ক্ষুধার্ত রাখবো না। যদি কোনোদিন আমরা পথের ফকিরও হয়ে যাই, আমি আপনাকে কবুতর ধরে রেধে খাওয়াবো কিন্তু দয়া করে আমাকে অন্ধকারে একা রেখে যাবেন না। আমি অন্ধকার খুব ভয় পাই। একবার হয়েছি কি জানেন রাতে ঘুমিয়ে আছি হঠাৎ ঘরের মেইন সুইচ পরে গেলো। ডিম লাইট বন্ধ হয়ে গেলো। মেইন সুইচ পরার শব্দে ঘুম ভেঙে গেলো। ঘুম থেকে উঠে দেখি ডিম লাইট বন্ধ। বাইরের আবছা আলোয় মনে হলো আমার পাশে একটা হাত পরে আছে অথচ সেটি আমারই হাত। আমিতো হতভম্ব। এরপর আরেকদিন কি হলো শুনেন…….”
মনে পরে সেইদিনরাতে আমি শুধু দুটি কথা বলতে পেরেছি। প্রথম কথা ছিল “ফ্যানটা একটু ছাড়ি?” দ্বিতীয় কথা ছিল “আমি একটু বাথরুমে যেতে পারি।” এরকম একটা মেয়েকে না ভালোবেসে পারা যায় না৷
তবুও এখন আর নিতে পারিনা৷ ধৈর্য আর সহ্য দুজনেই আপন ভাই৷ এই দুজন মাঝে মাঝে খুব দুষ্টামি করে। কথা শুনতে চায় না। তখনই হয় আসল সমস্যা৷ এই দুইভাই যখন আয়ত্তে থাকে তখন আর কোনো সমস্যা হয় না৷
এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে বাস স্ট্যান্ডেে চলে এসেছি বুঝতেও পারিনি। চলে যেহেতু এসেছি একটা সিগারেট খাওয়া যাক৷ সিগারেট খেতে খেতে আসে পাশের মানুষের সুখ দুঃখ উপভোগ করা যাক। একটা সিগারেট ধরালাম। গিয়ে বসলাম। কিছু জায়গা আছে যা আপনাকে কখনো ঘুমন্ত অবস্থায় দেখতে হবে না। এই জায়গায় আপনি কিছু উদ্ভট মানুষ দেখবেন। তারাও আমার মতো বাসায় সমস্যার কারণে এখানে এসে বসে থাকে। তবে তাদের দেখলে বোঝা যায় না। আমরা আসলে ছদ্মবেশী। কিন্তু পরিপূর্ণ নই। এরকম ছদ্মবেশী অনেক দেখা যায় দামি হাস্পাতাল গুলোতে। দেখা যায় অনেক গরম পরেছে। যেকোনো একটা হাস্পাতালেযেয়ে বসে থাকা যায়। কেউ মানা করবেনা। এসির বাতাস তখন খুবই উপভোগ যোগ্য। মারকেট গুলোও সেইম। একদিন তো দেখি একদল ছেলে মার্কেট এ ঘুরছে। তাদের হাতে ফুটবল, পা ভর্তি কাঁদা। তারাও সেরকমই। খেলে শরীর ঠান্ডা করতে মার্কেটে ঢুকে পরেছে।
আমি একা যখন থাকি তখন এরকম আজেবাজে চিন্তা করি। ভাল্লাগে। সৃষ্টিকর্তা চিন্তা করার শক্তি দিয়ে মানবজাতিকে খুবই করূণা করেছেন। কিন্তু সেই চিন্তায় আমার সাময়িক বিরতি নিতে হলো। অনেকক্ষন ধরে দেখছিলাম একজন লোক যার বয়স চল্লিশের কাছাকাছি হবে খালি পান খাচ্ছে। মুখ ভর্তি পান। একসাথে দুটো পান কিভাবে খাচ্ছে এই প্রশ্ন আমার মাথায় এসেছিলো, যাক এখন এই প্রশ্ন করা যাবে। লোকটি পাশেই এসে বসেছে। ক্রমাগত নিশ্বাস নিচ্ছে। হাপানির সমস্যা আছে মনে হয়। আমি জিজ্ঞেস করলাম।
– ঠিক আছেন ?
– জ্বী, অনেকক্ষন পান খেয়েছি তো। কাঁচা সুপারি এতো খাওয়া ঠিক হয় নাই।
– হুম, বসেন কারো জন্য অপেক্ষা করছেন ?
– জ্বী হ্যাঁ, স্ত্রীর জন্য অপেক্ষা করতেছি।
– ওহ।
– ভাই আপনে কারো জন্য অপেক্ষা করতাছেন ?
প্রথমে ভাবলাম বলি-“জ্বী, ভাই। আমার বড় চাচা আসতেছে সিলেট থেকে। এক বস্তা চা নিয়ে।” পরে ভাবলাম রাস্তায় দেখা একটা লোক আর জীবনেও দেখা হয় কিনা সন্দেহ। সত্যটাই বলি।
– না, ভাই। বাসায় বউ এর সাথে ঝগড়া লেগেছে তাই এখানে এসে বসে আছি ।
– ওহ, বুঝতে পারছি।
লোকটা চুপ হয়ে গেলো। কিছু বললো না। কিন্তু আমার খুব কথা বলতে ইচ্ছে করছে। এতোক্ষন একা ছিলাম একাই ভালো লাগছিল। কিন্তু এখন কারো সাথে কথা বলার জন্য হৃদয় লাফ দিচ্ছে। নিঃসঙ্গতা আসলে উপভোগ্য কিন্তু যখন কারো সাথে কথা বলার সুযোগ আসে কিন্তু কথা বলা যায় না তখন আর নিঃসঙ্গতা উপভোগ্য থাকে না। আমার ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। কিন্তু কোনোভাবে সৃষ্টিকর্তা আমার কথা শুনেছেন। হঠাৎ করে বলে উঠলেন-” ভাই একটা গল্প শুনবেন।” এমন কিছুই মনে মনে চাচ্ছিলাম তবুও খানিকটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম।
– জ্বী, বলুন।
লোকটা একটু নড়েচড়ে বসলো। পানের পিক ফেলে বলা শুরু করলো।
– বুঝলেন ভাই। আমি হইলাম এই দুনিয়ায় অনেক বড় মাপের একজন প্রতারক। আমার জন্মের পর আব্বা আমার ছোট খালার সাথে ভাইগা যায়। আমার আম্মা বাড়িতে কাম করতো। মাসে কামাই করতো পাঁচ হাজার টাকার মতো। আমি যখন বড় হই। মানে ছয়-সাত বছর তখন দেখতাম আমার মায়ের কাছে রাত কইরা বেটারা আসতো। প্রায় রাতই আম্মা আমারে রান্নাঘরে ঘুম পারাইয়া দরজায় খিল দিয়া যাইতো গা। ভিতর থেকে অনেকধরণের শব্দ আসতো। তখন বুঝতাম না। আসতে আসতে বড় হইলাম। সব বুঝলাম ।একদিন রাতে রান্নাঘরের জানালা কাইটা পালায় গেলাম। সেই বস্তিতে এখনো আমি যাই নাই। আম্মায় কেমন আসে জানি না। কিন্তু এরপর জীবন বদলানো শুরু করলো। যখন আমার বারো বছর বয়স তখন আমার সাথে দেখা হইলো রবিউল নামের এক বেটার সাথে। সে আমারে বললো “তুই আমার জায়গায় থাকবি ,খাবি, ঘুমাবি। চল।” আমি তার সাথে হাটতে হাটতে চলে গেলাম। তিন তলা বাড়ি। তিনি যেখানে থাকে তার পাশের ঘরে আমারে থাকতে দিলো। দশ-বারো দিন ভালোই আছিলো। কিছুদিন পর একটা লোকরে আমার সামনে আইনা বললো-” উনি তোর পা বাঁকানো শিখায় দিবো, ভালোমতো শিখবি।” আমি জিগাইলাম-“ক্যা ?” উনি কইলো-” ভিক্ষা করবি। প্রতিবন্ধি সাজতে হইবো, মেলা টাকা পাবি।” আমি শিখা শুরু করলাম। ঐ বেডা আবার আগের থেকেই এসব শিখায় তাই আমারেও তাড়াতাড়ি শিখায় ফেলছে এরপর শুরু হইলো ভিক্ষা করা। এই মসজিদের সামনে, পার্কে ,স্কুল-কলেজের সামনে পা বাকাইয়া গান ধরি। দিনে দুইশ টাকা আয় হইলে রবিউল কাকা রাখে একশ দশ আমারে দেয় নব্বই। অই বাসায় সবাই ওমনি। কেউ বোবার, কেউ অন্ধের অভিনয় করে ভিক্ষা করে আর কেউ কেউ গান গায়ে। রবিউল কাকুর একটা রক্ষিতা ছিলো। নাম ছিল শিউলি। আমার নাম নতুন করে রাখা হলো সামাদ। সেই সময় আমি শিউলিকে আপা বইলা ডাকতাম। আমার থেকে তিন বছরের বড় ছিলো। টাকা চিনানো থেকে শুরু করে বাংলা পড়ানো আর টাকা গুনা সবই তিনি আমারে শিখায়ছিলেন। ওখানের সুবিধা হইলো বাড়ি ভাড়া দেওয়া লাগেনা। খাওইয়ার টাকা লাগেনা। যা টাকা দিনে পাই সব জমাই। ওখানের অনেকে ভিক্ষার টাকা দিয়ে ব্যাবসা শুরু করে দেয়। আমি কিছু করিনা। করার কোনো আগ্রহবোধও করিনা। আমার তখন সতের বছর বয়স। আমি একদিন ভিক্ষা করে আসছি দেখি রবিউল ভাই মদ খায়ে মাতাল। আমারে বললো-” শিউলিরে লাল শাড়ি পড়ে রুমে আসতে বল।” আমি তাই করলাম। পরেরদিন সকালে উইঠা শিউলি আমারে বললো-” উনি মাতাল ছিল এইটা আমারে কস নাই কেন?”। আমি কেন জানি কোনো উত্তর দিতে পারলাম না। শিউলির কান্দন ঐদিন আর থামেনা। কিন্তু এর দেড় মাস পর হঠাৎ একদিন রবিউল ভাই আমারে ডাকলেন।
– সামাদ,বস। কি অবস্থা ? খাওয়া দাওয়া কেমন চলে ?
– কাকা, ভালোই।
– সামাদ, তুই আমার এখানে কয় বছর ধইরা আসোস?
– কাকা, ছয়-সাত বছর হইবো।
– যেরকম জীবন তোর হইতে পারতো তা কিন্তু হয় নাই। কার জন্য হয় নাই ?
– আপনার জন্য কাকা।
– হুম, এখন আমাদের এখানে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা জমানোর পর মানুষ চলে যায়। তোর ঐ পরিমাণ টাকা হয়ে গেছে।
– জানি, কাকা। কিছুদিনের মধ্যেই চইলা যামু।
– যাওয়ার আগে আমার একটা কথা রাখতে হইবো।
– কি কাকা ?
– শিউলিরে তোর বিয়া করা লাগবো।
আমি পাথরের লাহান কাকার দিকে চাইয়া থাকলাম। কিছুক্ষন পর কাকা আমারে একটা পাঞ্জাবী দিলো। শিউলিরে দিলো লাল শাড়ি। রবিউল কাকা যেই ঘরে থাকতো ঐ ঘরেই আমাগো বাসর হইলো। বাসর ঘরে ঢুকতেই শিউলি বইলা উঠলো-” সামাদ, তুই আমার ছোট তাও ত স্বামী। তোর কাছে আমি নিজেরে বিলায় দিতাম কিন্তু আমার পেটে যে বাচ্চা। যেদিন উনি মাতাল ছিল ঐদিন কোনো নিরাপত্তা উনি ব্যবহার করে নাই। উনি মাতাল থাকা অবস্থায় আমি কখনো তার কাছে যাইতাম না।” সেদিন কেন জানি আমি কোনো কষ্ট পাই নাই। সুন্দর মত পরেরদিন দুইজনে কাকারে সালাম কইরা বাইর হইয়া গেলাম। উঠলাম এক বস্তিতে। ভালোই দিন চলতাছিল। মনে মনে খুশি ছিলাম একটা বাচ্চা আর মায়ের জীবন বাচাইতে পারছি। এইটা ত সুখের ব্যাপার। কিন্তু শিউলিরে বাচাইতে পারলাম না। বাচ্চাটারে জন্ম দিতে যাইয়া মারা গেলো। এরপর বাচ্চা কোলে নিয়াই করলাম ভিক্ষা। সে সময় অনেক লাভ করি। দালাল ধইরা পা বাঁকানোর ব্যাপারটা দিয়ে প্রতিবন্ধি ভাতাও বানায় ফেললাম। বাচ্চাটারে দিলাম স্কুলে। ভিক্ষা কইরা আর ভাতার টাকা দিয়ে বাপ-বেটার হেবি চলে। পোলাডা ছিল ভয়ানক মেধাবী। নাম রাখছিলাম কাউসার। এই ভিক্ষা অনেক আগেই ছাড়তে পারতাম। পোলা স্কুল-কলেজে পড়ার সময় নিজেই টিউশুনি করাইয়া নিজেই চলতো। আমি ফিরে আসতে পারতাম না ভিক্ষা থেকে। মেধার জোড়ে পোলায় চান্স পাইলো ঢাকা ভারসিটিতে। বড় ভাইদের সাথে হাত মিলাইয়া ব্যবসা ধরলো। লাভও করলো। আমারে ভিক্ষা করতে দেয় না। উঠায় নিয়া আসে। তাও আমি যাইগা। এরপর একদিন পোলা আমারে একটা অন্যরকম কথা কইয়া উঠলো। কথাটা কওয়ার আগে ভাই ঐ পানওয়ালাডারে ডাক দেন একটা পান খামু।
তার কথায় একটা ঘোর তৈরী হয়ে গিয়েছিল। আমি পানওয়ালাকে ডাক দিলাম। একটা সিগারেট ধরালাম । দুটো পান নিজেই কিনে দিলাম এরপর হাসতে হাসতে বললাম- “ভাই আপনে কিন্তু আসলেই প্রতারক।” সে মুখ খানিকটা বিষন্ন করে বলে উঠলো-“ঠিকই।”
আমি আর কথা না বাড়িয়ে ঘটনায় প্রবেশ করতে বললাম।
তিনি বলা শুরু করলেন,
বুঝলেন ভাই, জীবনটা হয়ে গিয়েছিলো পাবলিক টইয়লেট এর মতো। এক নম্বর এর জন্য পাঁচ টাকা, দুই নম্বরের জন্য দশ টাকা। পাবলিক টাকা দেয় যাতে তা পরিস্কার থাকে। কিন্তু পাবলিক টইয়লেট কখনো পরিস্কার থাকেনা। আমারো একি অবস্থা ছেলে ব্যবসা করে। ভালো বাসায় থাকি তবুও ভিক্ষার নেশা ছাড়ে না। তাই একদিন ছেলে বলে বসলো।”বাবা তোমার না বিয়ে করা উচিত। আমার একটা মেয়ের সাথে পরিচয় আছে। সবাই খালা বলে ডাকি। আমাকে অনেক আদর করে। অনেক অসহায়। কেউ নাই। আর তার চেয়েও বড় কথা আমি মায়ের ভালোবাসা চাই। যা উনি দিতে পারবেন।”প্রথমে একটু জুবুথুবু হয়ে গেলাম। পরে পোলার জোড়াজুড়িতে আর পোলার শেষ কথাটার জন্য আমি ওনাকে বিয়ে করে ফেললাম। অবাক করা বিষয় আমি তার নামও জানিনা। জীবনে আবারো বাসর ঘরে ঢুকা লাগলো। বয়সে আমার থেকে সাত বছরে ছোট একটা মহিলার চোখ যে এতো সুন্দর হইতে পারে তা আমার জানা ছিলো না। মানে ভাই চোখটা হাত দিয়ে ধরতে ইচ্ছা করে। কিন্তু ভাই এরপর যে অপেক্ষা করতেছিলো অনেক বড় একটা সংবাদ। আমি মিলন করতে যায়ে দেখি সে স্বাভাবিক নারী না। সে তৃতীয় লিঙ্গের মানে যাকে আমরা বলি হিজড়া। আমি তার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম-” কেনো আমার এতো বড় ক্ষতি করলা?” সে কান্না করতে করতে উত্তরে বললো-“আমি বলতে নিছিলাম কিন্তু কাওসার আমাকে বলছিলো তার একজন মা প্রয়োজন। আমি মা হওয়া থেকে নিজেকে বঞ্চিত করতে পারিনাই।” ঐদিন ভাই নিজেরে খুব অসহায় লাগছে যা ছোট বেলাতেও লাগেনাই। শিউলি মারা যাওয়ার পরও লাগে নাই। সেদিন বুঝলাম প্রতারণা করলে তা আপনার কাছে ডিগবাজি দিয়া ফিরা আইবোই। আমারও তাই হইছে। কিন্তু তার কাউসারের প্রতি মমতা দেখে আর কিছু বলতে পারিনাই। বিয়া হইছে চার বছর। আমি এই সমাজ থেকে বঞ্চিত মানুষটার লগেই আছি। ভাই, বাস আইসা পরছে। আজ যাই। আপনারে অনেক বিরক্ত করলাম।
সে চলে যাওয়ার সময় কেন জানি আমি কিছু বলতে পারছিলাম না। বাড়বার কথা মুখে আটকে যাচ্ছিলো। সে পানের পিক ফেলে উঠে গেলো। বাস থেকে যিনি নামলো তার চেহারা আহামুড়ি সুন্দর না তবে তার চোখ ছিলো ইন্দ্রানীর আঁখি। আমার মনে হচ্ছিলো চার বছর ধরে কেন একশ বছরও এই আলোকিত চোখ দেখে সংসার করা সামাদ সাহেবের জন্য কোনো ব্যাপার না। চোখ গুলো দেখে আমি হাল্কা ধাক্কা খেলাম কারণ এরকম চোখ আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। কার চোখ তা মনে করতে পারলাম না।
সামাদ সাহেব তার সমাজবঞ্চিত স্ত্রীকে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। এক হাতে তার স্ত্রীর হাত অন্য হাতে একটি ব্যাগ। এই অপূর্ব দৃশ্য দেখে কেন জানি নিজেকে খুব সুখী মনে হলো। ইচ্ছে করছিলো বেঞ্চ থেকে উঠে দৌড়ে তাদের সামনে যেয়ে বলি-“আপনারা অনেক সুখী। ‘,
পরক্ষণেই মনে পরলো এই চোখ জোড়া আমি দেখিছিলাম কয়েকবছর আগে। আমার স্ত্রী তার প্রথম সন্তান জন্ম দিলো। কন্যা সন্তান। তাকে যখন আমার কোলে দেওয়া হলো সে দেখি ড্যাব ড্যাব করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। সেই অবিকল চোখ আজ আমি আবার দেখলাম। আমার মেয়েটা এই দুনিয়ায় এক মাসের জন্য এসেছিল। এরপর থেকেই তার মা খানিকটা অস্বাভাবিক তবুও আমি তাকে অনেক ভালোবাসি। সুখ-দুখ মিলিয়েই তো এই দুনিয়া। কষ্ট যদি না থাকতো তাহলে এই দুনিয়াই হতো চিরশান্তির স্থান। দুনিয়াই যদি চিরশান্তির স্থান হয় তবে মানুষ পরকালের শান্তির জন্য কেনো লড়বে। কিন্তু যখন আমার মেয়েকে কোলে নিয়েছিলাম তার সেই ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে থাকাটা ছিল এক স্বর্গীয় সুখ। আমি তাকে কোলে নিয়ে পাশে দাড়িয়ে থাকা ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করেছিলাম-“সুখ নামক জিনিসটা উপভোগ করার ক্ষমতা সৃষ্টিকর্তা মানুষকে এতো নিপুণভাবে কেন দিলে,  বলতে পারবেন?”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here