মমতাময়ীর মায়া

আরিফুল হক বিজয়

0
188
bengali short stories

গতকাল সন্ধ্যা নামার খানিক পর। বাহিরে বৃষ্টি হচ্ছে, এই ঝিরিঝিরি তো আবার রিমঝিম সুরে মুষলধারার বৃষ্টি। টিনের চালে সেই সুর ঠিক কতটা মায়াবী আর মোহময় সেটা অনুভব করতেই সামনের ঘরে আমার বছর দশেকের ৬ ফুট লম্বা ৪ ফুট চওড়া পুরাতন খাটটায় শুয়ে চোখ বন্ধ করে ছিলাম। কানের তীক্ষ্ণ শ্রবণশক্তির সবটাই উৎসুক হয়ে ওত পেতে ছিলো টিনের চালের সেই রিমঝিম কিংবা ঝিরিঝিরি শব্দের মায়াবী মুগ্ধতায়।

শুয়ে শুয়ে চোখ বুঝে এখন কি করবো না করবো ভাবছি। হঠাৎ অনুভব করলাম, কার চিরচেনা হাত যেন আমার চুল থেকে শুরু করে মুখমন্ডলেও কি একটা মায়াবী স্পর্শে শীতল পরশ বুলিয়ে যাচ্ছে। অন্য সময় হলে হুট করে আমি লাফিয়ে উঠতাম কিংবা ভেঙ্গে যেতো ভ্রম। কিন্তু এবার ঠিক সেটা হচ্ছে না। হাতটা ঠিক কোন জায়গায় যেনো অতি আপন এবং চিরচেনা মনে হচ্ছে!

ধীরে ধীরে আমার স্মৃতিশক্তি জানান দিতে শুরু করলো, এই হাত আমার জন্ম থেকে আমাকে এই পর্যন্ত দিয়ে এসেছে অগাধ স্নেহ, শীতল পরশ এবং দুষ্প্রাপ্য ভালোবাসা। এই হাতটা না থাকলে আমার আর আমি হয়ে উঠা হতো না। হাতের স্পর্শটা আরো সিওর হতেই যেন আমার কানে এসে লাগে কারও তীক্ষ্ণ কন্ঠস্বর, ‘আব্বা! আমি তোকে জড়িয়ে ধরে একটু শুই?’
কি মায়াবী আবদার!

আমার চোখের পাতা হুট করে খুলে যায়, ভ্রম ভেঙ্গে যায়, আমি তাকিয়ে থাকি টিনের চালের দিকে। স্নেহের মমতার সমুদ্র আমার ছোট্ট বুকে উত্থাল পাত্থাল ঝড় তুলে জানান দেয় ঠিক কতটা মমতাময়ী এই নারী, ঠিক কতটা মায়াবী আর চিরচেনা তার মাতৃত্বের রূপ। আমার ধরে আসা গলায় অস্পষ্ট স্বরে একটা শব্দই শুধু বের হয়, ‘আম্মা!’

আমি বাকশক্তিহীন হয়ে যাই। আর কিছু বলতে পারি না। টিনের চালের সিলিংয়ে তাকানো চোখদুটো তখন ফিরে যায় ইট পাথরের নগরীর ভ্রমহীন স্মৃতিতে। যেখানে মা নেই, নেই তার স্নেহের সুর কিংবা ওই চিরচেনা হাতের একটু মায়ার পরশ। সারাদিনের ব্যস্ততা শেষে নীড়ে ফিরে বিশাল চওড়া খাটের একপ্রান্তে গুটিসুটি মেরে শুয়ে থাকি। কই? কেউ তো এসে বলে না, ‘আব্বা! আমি তোকে জড়িয়ে ধরে একটু শুই?’ সেই দিনগুলো, রাতগুলো আর সময়গুলো বিস্মৃতি করে রাখতে চাই। কিন্তু এই সময়েই কেন ফিরে আসে?

আমি উত্তর খুঁজতে থাকি আনমনে ভ্রমহীনভাবে সিলিংয়ের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে। অথচ শহুরে সেই স্মৃতিগুলো ক্ষনিকের জন্য বিস্মৃত করে দেয়ার মানুষটা আমার পাশেই। হঠাৎ তার হাতের ঝাকুনি লাগে আমার শরীরে ‘তুই কী ভাবিস? কী?’ আমি দ্রুত নিজেকে সামলে নেই, গহীনে জমে থাকা জল লুকোতে মাথা গুঁজে দেই তার বুকে, নিজেকে হারিয়ে ফেলি মমতাময়ীর অদ্ভুত মায়ায়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here