ভালবাসা ও বাস্তবতা

সাইমুম শারিক হিমেল

0
153
best bangla uponnash

হাসান সাহেব অপুর কলিগ। উনি অপুকে পছন্দ করেন।শুধু পছন্দ করেন তা না, নিজের ভাইয়ের মত মনে করেন। একবার অপুর জ্বর ছিল দীর্ঘ সাত দিন। প্রথম দিনই তাকে মেস থেকে বাসায় এনে রেখেছিলেন হাসান সাহেব। সেবাযত্নের কোন কমতি ছিল না। সুস্থ হয়েই অপুকে বাসায় ফিরতে দিয়েছিলেন হাসান সাহেবের স্ত্রী।

আজ হাসান সাহেবের ছোট মেয়ের জন্মদিন। বাড়িতে ছোটখাটো একটা পার্টির ব্যবস্থা করেছেন উনি। খুব কাছের মানুষদেরই দাওয়াত দিয়েছেন। অপুকেও দিয়েছেন। শুধু দাওয়াত দিয়েছেন তা না রীতিমত জোরও করেছেন অনেক। কিন্তু অপু যেতে অপারগতা প্রকাশ করল।কারণ চাকরি শেষ করেই তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরা অপুর যেন প্রতিদিনকার রুটিন। বাড়ি ফিরেই পড়তে বসে অপু। এ রুটিন গত দুই বছরে একটুর জন্যেও হেরফের হইনি।এমনকি তার অসুখের সময়ও না। কারণ একটা সরকারি চাকরি তার খুভ প্রয়োজন। শুভ্রাকে সে কথা দিয়েছে সরকারি চাকরী পেয়েই তার বাবার কাছে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যাবে। শুভ্রার বাবা করিম সাহেব একঘুয়েমি পোষণ করেন সরকারি চাকরিজীবী ছেলের সাথে শুভ্রার বিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে। তাই সরকারি চাকরিই কেবল শুভ্রা-অপুর এই দশ বছরের সুন্দর সম্পর্কের নতুন রূপ দান করতে পারে।

প্রায় প্রতিটা সরকারি চাকরি পরিক্ষায় অপু অংশগ্রহণ করে। তার পরিক্ষা প্রস্তুতিও অনেক ভাল।কিন্তু কোন এক অজানা কারণে তার চাকরি হইনা বারবারই। সরকারি চাকরি যেন স্বর্ণের খনি পাওয়ার চেয়েও দুঃসাধ্য।

শুভ্রা প্রতিবারই গভীর আগ্রহে বসে থাকে অপুর সরকারি চাকরি পরীক্ষার ফলাফলে নাম আসার। কিন্তু বারবারই সে হতাশ হয় এবং বাবার কাছে আর কিছু দিন সময় চেয়ে নেয়। এভাবে প্রাই দুবছর অনেক ভাল সম্বন্ধ ফিরিয়ে দেয় শুভ্রা। এবার শুভ্রার বাবা বলে দিয়েছেন, তিনি আর সময় দিতে পারবেন না। সামনের পরীক্ষষায় অপুর সরকারি চাকরি না হলেই উনি বিয়ে দিবেন শুভ্রাকে।

আজ ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। মেসের অনেকে দিয়েছে পরীক্ষা। তারা ফলাফল শিট মেসে নিয়েও গিয়েছে এতক্ষণে। অপুর অফিস শেষ হল কিন্তু তার মেসে ফিরে গিয়ে ফলাফল দেখতে ইচ্ছে করছে না। ভয় হচ্ছে তার। ছোট থাকতেই মা-বাবকে হারিয়েছে অপু।শুভ্রাকে সে হারাতে চায় না।কারণ তার জীবন একমাত্র শুভ্রা কেন্দ্রিক। এ নিয়ে সে একবার একটা কবিতাও লিখেছিল—

সৃষ্টিকর্তা উপরে, আর নিচে তুমি
আরতো কিছু চাইনা আমি।
সত্য কিনা মিথ্যা বলি জানে অন্তর্যামী
আরতো কিছু জানিনা আমি।

রাত ১ টা বেজে ৩০ মিনিট। অপু বাসায় না গিয়ে এখনও হেঁটে চলেছে জনবিরল এক রাস্তা দিয়ে। আকাশ জুড়ে মেঘ থাকলেও ভ্যাপসা গরমের কারণে পাঞ্জাবী হাতে নিয়ে খালি গায়ে হেঁটে চলেছে অপু। মন খারাপের কারণেই এই উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটা। মন যেমন তেমন খারাপ নয়। ভয়াবহ ধরণের খারাপ। সে ফলাফল দেখতে চায় না। বৃষ্টি শুরু হলে সারারাত সে বৃষ্টিতে ভিজল। ভোররাতে সে শুভ্রার বাসার সামনে গিয়ে অজ্ঞান হল।

এরপর টানা ২০ দিন হাসপাতালে অজ্ঞান অবস্থায় ছিল অপু। মধ্যে একবার কিছুক্ষণের জন্য জ্ঞান ফিরেছিল তার। কিন্তু কিছু বলার অবস্থায় ছিল না। প্রায় একমাস পর সুস্থ হয়ে সরাসরি শুভ্রায় বাসায় গেল। কিন্তু এর মধ্যে করিম সাহেব শুভ্রার বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন। শুভ্রার বাসা থেকে নিয়তির বোঝা নিয়ে সে মেসে ফিরল। মেসে ফেরা মাত্রই সকলে তাকে ঘিরে ধরে অভিনন্দন জানাল কারণ শেষমেশ তার সরকারি চাকরি হয়েছে গত পরীক্ষায়।

রীতিমত ২২০ ভোল্টের বিদ্যুৎ যেন হঠাৎই তার দেহে বয়ে গেল। সে যেন মেনে নিতে পারছিল না তার সাথে কেন এমন হল!

ছোট গল্পের সাধারণত কোন শেষ থাকে না। কিন্তু এই গল্পের শেষ রয়েছে।

অপু বর্তমানে রাস্তাই যাকেই দেখে তাকে ভেংচিয়ে ভয় লাগিয়ে দেয়। হয়ত তার ভেংচানোর কোন উদ্দেশ্যে থাকে না। উদ্দেশ্য থাকে হয়ত কথা বলার৷ মানুষের সাথে কথা বলার। কিন্তু এই শহরে দাড়িতে-চুলে জটা পড়া উন্মাদের মত কারো সাথে কথা বলার প্রয়োজন কেউ বোধ করে না। কিন্তু পাগল দেখে যে ভয় পাচ্ছে তা প্রকাশের প্রয়োজন বোধ করে ঠিকই।

পৃথিবীতে সবারই একটা নিজের মানুষ লাগে। নিজের একটা জায়গা লাগে। সবচেয়ে শক্ত, কঠিন যে মানুষটা, তারও। সেও চায় সেই জায়গাটাতে গিয়ে সে তার কঠিন আবরণটা খুলে নিরাভারণ হয়ে যেতে। ভানহীন, শিশুর মতো…

অপুর অমন কোন মানুষ নেই যার সামনে গিয়ে পাগলামীর আবরণ খুলে ঠিক আগের অপু হওয়ার কারণ জানতে চাইবে? তার জীবনের এত নির্মম ভাগ্যের কারণ জানতে চাইবে?

তাই গালি শোনার অজুহাতে কথা বলার উদ্যেশ্যেই হয়ত অপু সামনে যাকে পায় ভয় দেখায়। হয়ত সত্যিকারের পাগল বলেই এমনটা করে অপু।

কিন্তু শুভ্রারা বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে ঠিকই নতুন অপুকে নিয়ে সব কিছু আবার নতুন করে সাজায়। এই সাজানো জুড়ে ভাগ্যের কাছে হারা মানা অপুদের কোন জায়গা থাকে না। জায়গা থাকে জীবনযুদ্ধে সফল অপুদের।
কিন্তু শুভ্রাদের মনের গভীরে কোন এক জায়গায় জুড়ে অপুরা ঠিকই থেকে যায়। থেকে যায় কাটানো মধুর স্মৃতিগুলো, মধুর স্বপ্নগুলো।

আচ্ছা, আকাশের তারাগুলোর মধ্যে দূরত্ব লক্ষ লক্ষ ক্রোশ অথচ তারা কত কাছে অবস্থান করছে, এক তারার আলো অন্য তারাতে এসে পড়ছে। কিন্তু অপুর চারপাশে হাতের নাগালে এত মানুষ, অথচ অপু একা কেন?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here