রাত ও জীবনের কথা

সাইফুল ইসলাম নাদিম

0
181
shakchunnir golpo

সন্ধ্যা আসন্ন প্রায়, সূর্য তার তেজ শেষ হবার আগের ম্রিয়মাণ আলোটুকু দিয়েই ধরনীকে উত্তপ্ত করার ব্যর্থ চেষ্টা করছে। গোধূলির সেই আলো দালান টপকিয়ে যতটুকুই বুড়িগঙ্গার ব্যস্ত নদীতে পড়ছে, তাতেই খুব সুন্দর একটা পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। একপাড়ে লঞ্চঘাট অন্যপাড়ে তেলঘাট আর মাঝে বড়বড় লঞ্চ আর ছোটছোট নৌকার ভীড়ে বুড়িগঙ্গার এই সৌন্দর্যটুকু খুঁজে বের করাই দায়। নদীর দু’পাড়েই চলছে শেষ সময়ের ব্যস্ততা ঘনঘন লঞ্চের ভেঁপু, ট্রলারের ফটফট আওয়াজ সব মিলিয়ে একটা জমজমাট পরিবেশ। কেউ কারো দিকে তাকানোর সময় নেই এই ব্যস্ত নগরে।

হঠাৎ একটা দুর্ঘটনা কিছু সময়ের জন্য থমকে দিল এই ব্যস্ত সময়কে। নদীর দু’পাড়ের লোকজন এখনো নদী পার হওয়ার জন্য নৌকা ব্যবহার করে থাকেন। এমন একটি নৌকা যাত্রীসহ ডুবে গেলো। অতিরিক্ত আরোহীর কারনে নাকি অন্যকোনো নৌকা বা লঞ্চের সাথে ধাক্কা লেগে তা বোঝা গেলোনা পাড় থেকে। অল্প সময়ের ব্যবধানে প্রায় সকল যাত্রীকেই উদ্ধার করলো অন্যান্য নৌকার মাঝিরা মিলে। একজন মহিলাকে পানি থেকে তুলতেই বিলাপ শুরু করলো। কথা যতটুকু বুঝা গেলো তার বাচ্চা পানিতে। কথাটা শুনেই মতি মাঝি পানিতে লাফিয়ে পড়লো তার নৌকা ফেলেই। সেই বাচ্চাকেও উদ্ধার করা হলো। বাচ্চার বাবা নদীর পাড়ে ছিলেন। তিনি প্রথমেই যে কাজ করলেন তা হলো মতির গালে দুইটা থাপ্পড় মারলেন। তিনি মনে করেছিলেন মতির নৌকায় করেই তার আদরের বউ-বাচ্চা নদী পার হচ্ছিলো এবং অবশ্যই মতি যাত্রী বেশি নেওয়ায় নৌকা ডুবেছে। যখন সবাই মিলে সেই লোকের ভুল ভাঙ্গালো তখনও সে রাগে গজগজ করছিলো,
” এই মাঝি না হোক অন্য কেউতো ডুবিয়েছে” বলে বউ-বাচ্চা নিয়ে চলে গেলো। বড়লোকদের কেউ নিজের ভুলও স্বীকার করা শেখায়না। তাদের আশেপাশে সর্বদাই থাকে একদল চড়নদার। যারা সবকিছুতেই জ্বী হুজুর, জ্বী হুজুর করতে থাকে। সে হিসেবে এই লোককে খুব একটা দোষ দেওয়া যায়না। আর মতিরও খুব একটা ভাবান্তর দেখা যায়না। জীবনে গরীব হলে অনেক কিছুই চলে আসে বিনা আমন্ত্রণে লাঞ্ছনা, অপমান, অভাব ইত্যাদি। গরীবের অতশত গায়ে মাখলে চলে নাকি!

“মতি ভাই আইজকা বাসায় চইলা যাও, আইজ আর নাও বাওনের কাম নাই।” মাঝি সর্দার বাকের বললো।
“হ সর্দার। নাওটা ভালামতন বাইন্ধা রাইখা চইলা যাইতাসি।” মতি জবাব দিলো।

নিয়ন আলোতে পথ চলতে লাগলো মতি মাঝি। বস্তির প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছে। মানুষের কোলাহলের গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে দূর থেকেই। কথা কম চলে এখানে, খিস্তি চলে কথার আগে। মতি মাঝির জীবন কেটেছে এ বস্তিতেই। সংসার খুব বড় নয় মতির। এক ছেলে, এক মেয়ে বস্তির বাসিন্দা হিসেবে অবাক করার মত ব্যাপার। যেখানে একেকজনের ঘরে ৪-৫ জন করে বাচ্চাকাচ্চা। বস্তির লোকেরা ঠাট্টা করে বলে,
“মতি মাঝি ভদ্দরলোক হইছে। একপোলার বাপের কোন ভরসা আছেনি?”

মানুষের মুখের মন্দ কথা ফলে আগে, কিভাবে যেনো লোকের এই কথাটাও ফলে গেলো। মতির ছেলেটা ছোট থেকেই বাবা, মায়ের অবাধ্য ছিলো। ১৮ বছর হবার আগেই তার চেয়ে দু’বছরের বড় বস্তির এক মেয়েকে নিয়ে ভেগে গেলো। এখন গুজব শোনা যায়, তারা নাকি আশুলিয়ায় সংসার পেতেছে। মতির মেয়েটা ছেলের ছোট, বছরখানেক আগে বিয়ে দিয়েছিলো। দু’মাস ধরে বাবার বাড়িতে পড়ে আছে মেয়ে কথায় বুঝা যাচ্ছে জামাই টাকাপয়সা নেওয়ার জন্য পাঠিয়েছে। দোকান দেবে চা-সিগারেটের, তাই টাকার বড় প্রয়োজন। নিন্মবিত্তের পুরুষদের শেষ সমাধান শ্বশুরবাড়ির টাকা। বউ দিয়েও যে মতি মাঝি খুব খুশি তা বলা যায়না। পুরাতন মাঝি সর্দারের মেয়েকে বিয়ে করেছিলো মতি। প্রবাদ আছে, ‘বাঁশের চাইতে কঞ্চি বড়”। মাঝির সর্দার ছিলো মাটির মানুষ। মতির কাছে যখন মেয়েকে বিয়ে দিতে চেয়েছিলো সর্দার, মতি মানা করতে পারেনি সর্দারের ব্যবহারে, মেয়ের রূপে। ভুল ভাঙতে খুব বেশিদিন লাগেনি। একদিন রাতে দেরি হওয়াতে যখন মতির কলার ধরে বউ বলেছিলো, “সারা রাইত মাগিবাজি কইরা আইছস না!” সেদিনই বুঝে গিয়েছিলো মতি এই কঞ্চির ধার সারাজীবন ভোগ করতে হবে।

“কোন মাগীর কাছে গেছিলি? সারা শইল ভিজা ক্যা?” বউ মতিকে ভেজা গায়ে দেখে প্রথমেই এ কথা বললো।
“বাজান, মার মিজাজ ভালানা। ছোট মামা আইছিলো টাকা ধার চাইতে।” মেয়ে আগেই বাবাকে সাবধান করে দিলো।

“এই ঘরে বিয়া বইয়া আমার জীবনডা শেষ হইয়া গেলো। রফিকের বউরে রফিক সোনার কানের দুল বানায়া দিছে। আর আমার জীবন শেষ হইয়া গেলো এই সংসারের কাম করতে করতে।” বিলাপ করতে লাগলো মতির বউ।

“তোমারে কতবার কইছি কাউর লগে তুলনা দিবানা বউ।”

“না তুলনা দিমু ক্যান। সবার মতন বিছানায় যাইতে তো ঠিকই ভালা লাগে। কিছু কিনা দেওনের মুড়ত নাই হেই মাইন্সের আবার বিছনায় যাওনের শখ। আইজকার পর থেইকা তুই নিচে ঘুমাবি।” চেঁচাতে লাগলো মতির বউ।

গোসল সেরে এসে শরীরে তেল মাখতে মাখতে মেয়েকে বললো মতি,
“ওই বিলকিস ভাত দে।”
“ভাত রান্ধে নাই মায়। দুপুর থেইকাই কানতাছে।”

মেয়ের মুখে এই জবাব শুনেই মাথা গরম হয়ে গেলো মতি মাঝির। গামছাটা কাঁধে ফেলে খালি পায়েই দ্রুত বের হয়ে গেলো ঘর থেকে। বস্তির বাইরের দিকে রিকশার গ্যারেজ আছে সেখানে ভাত বিক্রি করে একজন মহিলা। আপাতত মতি মাঝির লক্ষ্য সেই ভাতের দোকান।

“মতি ভাই যে! কেমন আছো?”, জিজ্ঞেস করলো ফজল মিয়ার বউ। এই মহিলা রিকশার টুকিটাকি কাজ জানে, চাকার লিক সারায় দিনভর, এসবে চলে যায় ভালোই। জামাই ফজল মিয়া মারা গেছে বছরখানেক আগে হরতালের সময়। কিছুদিন কান্নাকাটি করে এই ভাতের দোকান চালু করে ফজলের বউ।

“আছিরে ভালাই আছি।”

“মিচা কতা কও ক্যান? আইজকাও ভাবীর লগে ঝগড়া হইছে মনে হয়।”, বলেই হাসতে লাগলো মহিলা। ভাত বিক্রি করা হয় রাস্তায় ফুটপাথের উপর। কোন দোকান নেই, চাল নেই,ছাউনি নেই। ভাতের গামলা থেকে ভাত নিয়ে, পাতিল থেকে তরকারী দিয়ে সোজা কাস্টমারের হাতে দেওয়া হয়। ফুটপাথের উপর বসেই খাওয়াদাওয়া। এসব দোকানের কাস্টমার সাধারণত রিকশাওয়ালা, নদীর মাঝি, বিভিন্ন দিনমজুর হয়ে থাকে।

ভাত খাওয়া শেষ করে মতি নদীর ঘাটে বাধা তার নৌকায় চলে গেলো। নৌকার মধ্যে আয়েশ করে বসে মতি গাঁজা ধরালো। বদ অভ্যাসের মধ্যে এই একটাই আছে মতি মাঝির। তাও প্রতিদিন না, মনে খুব বেশি কষ্ট জমলে তখন গাঁজা ধরায় মতি। ওস্তাদের কথা মনে পড়ে মতির, যে মতিকে গাঁজা খাওয়া শিখিয়েছে।

“বুঝছস মতি মনে দুক্ক যত বেশি থাকবো, তত জোরে গাঁজায় দম দিবি। কিছুক্ষণ পর দেখবি সব দুক্ক বাতাসের লগে ভাইসা যাইতাসে লগে তুই ও ভাসবি।” গাঁজা খাওয়ার পর মতির ওস্তাদ দার্শনিক টাইপের কথা বেশি বলতো। যার বেশিরভাগই নারী পুরুষের সম্পর্কিত এবং রাজনীতি নিয়ে। এগুলো সব বহু পুরাতন স্মৃতি। মতির মনে প্রতি রাতেই হানা দেয় যে স্মৃতি সেটা হচ্ছে তার ধূসর অতীত। যেটা জানেনা তার বউ ছেলেমেয়ে এমনকি মতি নিজেও জানতোনা তাকে জানিয়েছে তার বাবা। আজও মনে পড়ছে তার সেসব স্মৃতির কথা।

১৯৭১ সালের মার্চ মাস। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় ঢাকা শহরের পরিবেশ থমথমে। শহরের ভিতরস্থ রক্তক্ষরণ শুরু হয়ে গেছে ইতোমধ্যেই। স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্য বাংলাদেশি বিভিন্ন মহল, তাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে প্রস্তুত হচ্ছে। এদিক দিয়ে এগিয়ে আছে বুদ্ধিজীবী মহল। বিভিন্ন আলোচনা, সেমিনার, বক্তব্য, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ইত্যাদি করে সাহায্য করছে দেশের মুক্তির স্বপ্নে বিভোর মানুষ গুলোকে।

ডাঃ গৌতম ঢাকার একজন নামকরা ডাক্তার। ডাক্তারি মহলে নামডাক আছে ভালোই। অল্প বয়সে ভালোই সুনাম অর্জন করেছেন। ডাঃ গৌতম মনেপ্রাণে চাইছেন স্বাধীনতা যুদ্ধ হোক। পৃথিবীর মানচিত্রে নতুন একটা দেশ স্থান পাক। ডাঃ গৌতম আড়ালে কাজ করতে কম পছন্দ করেন। মাঝেমাঝে মেডিকেল কলেজ এর ক্লাসরুমেও উত্তপ্ত বক্তৃতা দিয়ে দেন। কলিগরা বুঝায় পাকিস্তান সরকারের নজরে পড়ে গেলে চাকরী এবং সম্মান দুটাই যাবে। কিন্তু অল্প বয়সে প্রতিপত্তি পাওয়া ডাক্তার এসবে কান দেন না কখনোই। রক্তে যার টগবগ করে ফুটছে তারুণ্য তার সেসবে কান দেওয়ার সময়ইবা কোথায়! ওনার কথা, “লুকোচুরি করে স্বাধীনতা অর্জন করা যায়না। অর্জন করতে হয় ছিনিয়ে।”

গৌতম এর বাড়ি শাঁখারীবাজার। বুড়িগঙ্গা নদীর কাছেই পৈত্রিক নিবাস। ডাঃ গৌতম এর স্ত্রী কনক সে নিজেও ডাক্তার। দু’বছর যাবত প্রাকটিস করছেনা কনক। ছেলে গোপালকে নিয়ে সারাদিন ব্যস্ত সময় কাটে তার। গোপাল এখন পাঁচ বছরের। আগে গোপালকে দেখতো বাসার কাজের মহিলা। দুঃসম্পর্কের আত্মীয়া হয় তাদের, সেই সব দেখেশুনে রাখতো সংসারের। স্বামী, স্ত্রী মিলে চাকরী করতো। রাতে ফিরে এসে দেখতো গোপাল ঘুমিয়ে গেছে। একদিন কনকের কাছে হাসপাতালে এক অসুস্থ বাচ্চাকে নিয়ে এসেছিলো এক মহিলা। বাচ্চার কথায় বুঝা গেলো মহিলাটি বাচ্চার মা নয়। কথার এক পর্যায়ে বাচ্চাটি মহিলাকে বলছিলো, “আমার মা, বাবা এখনো কি অফিসে? আমাকে কেন তারা কোথাও নিয়ে যায় না? সবসময় কেন তুমি নিয়ে আসো? আম্মু-আব্বু কি আমাকে ভালবাসে না? স্কুলের মিস তো বলেন আমি নাকি খুব ভালো ছেলে। তাহলে আম্মু-আব্বু কেন আমায় আদর করে না?” পরে মহিলার সাথে কথা বলে কনক বুঝলো ছেলেটির বাবা, মা চাকরী করে। কনকের মনে কি চিন্তা হলো কে জানে। হুট করেই সে চাকরী ছেড়ে দিয়ে পুরোদস্তুর গৃহিণী হয়ে গেলো। বাচ্চা নিয়েই এখন সময় কাটে কনকের।

“তোমাকে আমি বারবার নিষেধ করছি। এভাবে খোলাখুলি ভাবে সবার সামনে পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলো না। এতে সমস্যা হতে পারে ” স্বামীকে কথাগুলো বলছিলো কনক।

“নিজেদের সমস্যার কথা নিজেদেরই জানাতে হবে। স্বর্গ থেকে কোন দূত আসবেনা আমাদের সমস্যা সমাধান করতে। তাছাড়া সেমিনার, আলোচনা, আন্দোলন, ত্যাগ এসব ব্যতিত বাংলা ভাষায় কথাও বলতে পারতাম না আমরা। এত ভয় পেও নাতো কিছু হবেনা। গোপালের কি খবর?”

“তোমার ছেলে তোমার চেয়েও এক ডিগ্রী এগিয়ে। মিছিলের আওয়াজ শুনলেই জানালার কাছে দৌড়ে যায়।”

“দেখতে হবেনা ছেলেটা কার!”

গল্পগুজব করে স্বামী-স্ত্রী ঘুমিয়ে গেলো। মাঝ রাতে হঠাৎ দরজায় দড়াম দড়াম আওয়াজ হতে লাগলো। গৌতম আর কনক ঘুম থেকে জেগে গিয়ে লাফ দিয়ে বিছানায় বসলো।
“এত রাতে দরজায় এভাবে ধাক্কা দিচ্ছে কে?”, কনক ভয়ার্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো।
“কী জানি! আচ্ছা, আমি গিয়ে দেখে আসি। তুমি শুয়ে থাকো।”, পাঞ্জাবি গায়ে দিতে দিতে গৌতম বললো।
“না না, দাঁড়াও। তুমি দরজা খুলোনা দরকার নেই খোলার” কনক বললো।

এদিকে সমানে দরজায় ধাক্কা দিয়েই যাচ্ছে অনবরত । দুজনে ভয়ে ভয়ে দরজা খুলে দেখলো পাকবাহিনী দাঁড়িয়ে আছে।
” আপ ডঃ গৌতম হ্যায়?” এক পাকিস্তানি সৈন্য প্রশ্ন করলো। হ্যাঁ বলার সাথেসাথে কিছু বুঝে উঠার আগেই ব্রাশফায়ারে তাদের বুক ঝাঁঝড়া হয়ে গেলো, গুলির আওয়াজে বাড়ির দেয়াল কেঁপে উঠলো। মালাউন বলে পাকবাহিনী খিস্তি করলো কিছুক্ষণ, পুরো বাড়ি তছনছ করলো, বাড়িতে আর কাউকে খুঁজে না পেয়ে চলে গেলো।
রাতটি ছিলো ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ।

তারপরের ইতিহাস প্রায় সবার জানা। দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধের পর স্বাধীন হয় আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি। নতুন একটা নাম, নতুন একটা সূর্য বাংলাদেশ।

অজানা ইতিহাসটুকু হচ্ছে, দরজায় লাথির আওয়াজে কাজের মহিলাটারও ঘুম ভেঙ্গে যায়। গোলাগুলির শব্দ শুনে বাড়ির পেছনের দরজা দিয়ে সে গোপালকে নিয়ে কোনরকমে সদরঘাটে তার পরিচিত এক মাঝির কাছে গিয়েছিলো। কাজের মহিলা বলেছিলো, “দাদা, আজ রাতটুকু এই দুধের বাচ্চাটাকে আপনি আশ্রয় দেন। কাল সকালে ওকে নিয়ে আমি ইন্ডিয়া চলে যাবো। সকালে আমি আসবো ওকে নিতে।”

মহিলা পরদিন সকালে এসেছিলো ঠিকই বুড়িগঙ্গা নদীতে, কিন্তু লাশ হয়ে। যুদ্ধের সময়টুকু গোপালকে আগলে রেখেছিলো মাঝি নিজের সন্তানের মত করে।

দেখতে দেখতে দেশ স্বাধীন হয়ে গেলো। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে একদিন গোপালকে নিয়ে তাদের বাড়িতে গিয়েছিলো মাঝি। সেখানে গিয়ে দেখে ডাঃ গৌতম এর বাড়ি দখল করে নিয়েছে একদল মানুষ। মাঝিকে আড়ালে ডেকে নিয়ে একজন বলেছিলো,
“সরকারি হিসেবে যুদ্ধের সময় এই বাড়ির লোকজন সব মারা গেছে। এখন এই মালাউনের বাচ্চাসহ তোকে মেরে ফেললে কারো কিছু আসবে যাবেনা। মৃত মানুষকে দ্বিতীয়বার মেরে ফেললে কেউ কিছু জানতেও পারবেনা। তোর চেহারা যাতে আর জীবনে না দেখি।”

এই কথা শুনে মাঝি আর কখনো সেই বাড়ি মুখো হয়নি। কিন্তু দখলদাররা ছেলেটাকে ঠিকই খুঁজতে লাগলো মেরে ফেলার জন্য। শত্রুর নাকি শেষ রাখতে নেই।

মাঝি গোপালকে নিয়ে ঢাকা সদরঘাট থেকে কিছুটা দূরে এক বস্তিতে চলে গেলো। সেখানে গিয়ে গোপালের নাম রাখলো মতি মিয়া। এভাবেই ডাক্তার দম্পতির একমাত্র ছেলে ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে মতি মাঝি পরিচয়ে বেঁচে রইলো এই জাদুর শহরে।

ফজরের আযান দিচ্ছে। মতি মাঝির দু’গাল, দাড়ি ভেসে যাচ্ছে চোখের পানিতে। পাঁচ বছরের সময়ের কথা তার কিছুই মনে নেই। শুধু ঝাপসা মনে পড়ে একজন মমতাময়ীর মুখ, যিনি চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে দিতেন তার গোপালের চেহারাটা। এসব ইতিহাস তার বাবার কাছে শুনা। হ্যাঁ বাবাইতো, শুধু জন্মদাতাই বাবা নন। যিনি পুনর্জন্ম দিয়েছেন তিনিও বাবা।

ওজু করে নৌকাতেই নামাজের জন্য দাঁড়ালো মতি মাঝি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here