গোল্ডেন বয়েজের মাশরাফি!

আরিফুল হক বিজয়

0
156
bangla sad golpo

ক্লাস ফোর কি ফাইভের কথা। পুরান ঢাকার ইসলামবাগের আলীরঘাট নামক জায়গায় থাকি। জায়গাটা তখন ঠিক আবাসিক ছিলো বলা যাবে না। তখনকার ঘিঞ্জিযুক্ত শহরের পুরান ঢাকার আদি মহল্লা বলতে যেমনটা বোঝায় তেমনটা আর কি। বাসার পাশ দিয়েই চলে গেছে বুড়িগঙ্গা নদী। তখন অবশ্য পূর্বের মতো খরস্রোতা ছিলো না, তবে স্রোত ছিলো বেশ ভালোই। এই গিঞ্জিযুক্ত মহল্লাটাই তখন আমার কাছে স্বর্গ মনে হতো। অবশ্য ধীরে ধীরে আধুনিকতার ছোঁয়ায় সেটা এখন আমার ‘ছায়ানীড়‘।

এই মহল্লার আমার বয়সী আরো কতিপয় ছেলেদের একটা দল ছিলো আগে থেকেই। তারা রোজ ‘ইন্টারভিডা’ নামক স্কুলে যায়। স্কুল থেকে রোজ দুধ, আম, ডিম, বিস্কুট পায়। স্কুল শেষে এসে ওরা নদীতে ঝাঁপাঝাঁপি করে, কখনো ক্রিকেট খেলতে যায় রহমতগঞ্জ মাঠে, আবার কখনো বিদ্যুৎ চলে গেলে হুল্লোড় করে দলবেঁধে অন্ধকারে গোল্লাছুট খেলে। মহল্লার নতুন ছেলে হিসাবে ওদের সাথে আমার মেলামেশা তখনো হয়নি। হবেই বা কী করে? বাবার কড়া শাসন আর পাখির চোখ এড়িয়ে ওদের সাথে মেশা আমার কাছে তখন বিশ্ব জয় করার মতো দুঃসাধ্য ব্যাপারই বটে! তার উপর রোজ সকাল বিকাল বিদ্যা অর্জন করার মতো মহৎ কাজ করতে বসা।

একটা সময় এই ধরাবাঁধা নিয়ম মেনে চলা আমার মতো কিশোরকে দিয়ে আর হলো না। দু’টো বেতের ঘাঁ না হয় পড়লো পিঠে, নয়তো বাবার হাতের আস্ত একটা কিল, তবুও এই কিশোরদের দলটার সাথে আমার মেশা চাইই চাই। ধীরে ধীরে ওদের সাথে পরিচয় হলো। ওদের রোজ ব্যস্ত রুটিনের সাথে আমিও যুক্ত হয়ে গেলাম। স্কুল থেকে ফিরে নদীতে চলে ঝাঁপাঝাঁপি, মাঠে ক্রিকেট আর রাত হলে গোল্লাছুট। এই দলটার নেতা বলা হতো রবিন নামের একটা ছেলেকে। রবিন, রুবেল, রয়েল, পারভেজ, আরিফ, কালুসহ আরো হরেক রকম অদ্ভুতুড়ে নাম। মদন নামের একজন ছিলো। ওই বয়সেই বাতাসের বেগে দৌঁড়ে সে একটা মোটরসাইকেলকে পেছনে ফেলে দিলো!

ওদের একটা ক্রিকেট দল ছিলো। অবশ্য আমি ছিলাম দুধভাত। ক্রিকেট বুঝি ওদের থেকে ভালো বাট খেলতে নেয় না! দেখো কান্ড! ওরা রোজ শুক্রবার ক্রিকেট খেলতো। কখনো নিজেরা আবার কখনো মহল্লার সিনিয়রদের সাথে। তো একবার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো এবার নিজেদের একটা পেশাদারি দল করা দরকার। যেই কথা সেই কাজ, সিএ কোম্পানির পাতলা ব্যাট কেনা হলো, স্ট্যাম্প কেনা হলো। বাকি রইলো জার্সি? সবাই গেলো গুলিস্থান। বেশ ভাব ধরে কিনে নিয়ে আসা হলো ‘গ্রামীনফোন’র স্পন্সর করা বাংলাদেশ জাতীয় দলের তৎকালীন হলুদ কালো প্রাকটিস কিটের ফুটপাত কপি।

এবার বাসায় এনে গায়ে দেয়ার পালা। এরপর তো হুলস্থুল কান্ড! একটা জার্সি কারো শরীরে ডুকে তো ট্রাউজার কারো পায়েই ডুকে না, আবার কারো গায়ে কোনো জার্সি ফিট হয় তো অপরপাশ থেকে ধুমায়া হুংকার আসে “ওইডা আমার, দে কইছি..দে”। অতঃপর লেগে গেলো টানাটানি! পারভেজের দিকে তাকিয়ে দেখলাম ট্রাউজার টেনে টেনে সরোষে গর্জন করতেছে “ট্রাউজারের বাচ্চা, তুই ডুকবি না তোর বাপে ডুকবো”! আমি অবশ্য এর আগেও নাই, পিছেও নাই। সুতরাং হেসে হেসে খিল ধরা পেট চেপে খুশিমনে ঘরের পথ ধরলাম। পরদিন দলনেতা রবিন ব্যাট নিয়ে আসলো আমার কাছে “লেখ, গোল্ডেন বয়েজ…নিচে লেখ বেস্ট অব লাক”। ব্যস! অবশেষে জন্ম নিলো ওদের ক্লাব ‘গোল্ডেন বয়েজ’!

গোল্ডেন বয়েজ এবার মাঠে নামবে। ওদের প্রতিপক্ষ একটাই। এলাকার সিনিয়র আকতার মামাদের দল। আকতার মামাকে অবশ্য রবিন বলে মামা তো কালু বলে ভাই আবার রবিন আর কালু ভাই ভাই। তো কি হইলো? এ নিয়ে বেশ হাসিঠাট্টা চলে আড্ডায়। আমি বারবারের মতো দুধভাত হয়ে মাঠে গেলাম। গিয়ে দেখি মাথায় বাংলাদেশের পতাকা বেঁধে বিশাল রানআপ নিয়ে আগুনের গোলার মতো বল ছুঁড়ে মামাদের দলের আকাশকে বোল্ড করে দিলো রবিন। কিন্তু এ কি! দলনেতার গায়ে দেখি জার্সির বদলে শার্ট, পরনে পিওর ব্রান্ডেড ডেনিম জিন্স! এর কারন ভেবে হেসে গড়িয়ে পড়তেছি তো চোখে পড়লো পয়েন্টে দাঁড়ানো কালুর দিকে। লিকলিকে গড়নের কালো রংয়ের ছেলেটা জন্টি রোডসের মতো ঝাঁপাচ্ছে। একেকটা বল ঠেকাচ্ছে তো পরক্ষণেই ঝকঝকে সাদা দাঁত বের করে বিশ্বজয়ের হাসি হাসছে।

এরপর থেকে কেন জানি ছেলেটাকে আমার ভালো লাগতে শুরু হলো। ততদিনে আমিও দুধভাত প্লেয়ার তকমা ছেঁটে দিয়ে ওদের দলে খেলার সুযোগ পেয়ে গেলাম। শুধু যে সুযোগ তেমনটা নয়, পিছনের পায়ে ভর দিয়ে বলকে নবকুমার ইনস্টিটিউটের মাঠের রেইনট্রির মাথার ওপর দিয়ে রাস্তায় আছড়ে ফেলছি। আম্পায়ারের পেছনে দাড়িয়ে বুলেট গতির বলকে একহাতে তালুবন্দি করে ফেলারও রেকর্ড আছে। কালু তখন আমার বেশ ভালো বন্ধু। একদিন খেলা শেষে হেঁটে বাসায় ফিরছি। ওকে জিজ্ঞেস করলাম, তোর বোলিং অ্যাকশনটা কার মতো বল দেখি? বিস্ময়করভাবে কালু বলে উঠলো “মাশরাফি, আমি মাশরাফি হতে চাই”!

কালুর বাবা নেই। শহরের এই ঘিঞ্জি মহল্লায় এক রুমের এক কামরায় ওকে নিয়ে ওর মায়ের বেঁচে থাকার সংগ্রাম। ছেলেটা পড়ালেখায় ক্লাসের ফার্স্টবয়, খেলাধুলায়ও খুব ভালো, কথাবার্তায় বত্রিশ পাটি ঝঁকঝঁকে দাত সবসময় বের করে রাখে। কোন একটা অদ্ভুত কারনে ওর প্রতি সেদিনের পর থেকে আমার মায়ার জগতটা বেড়ে চললো। যখনই খেলতে যেতাম, লং অনে বা কাভারে দাঁড়িয়ে দেখতাম, মাশরাফির মতো কলার উচিয়ে ছোট্ট একটা লাফ দিয়ে সোজা রানআপে দৌঁড়ে চলছে ছেলেটা। দৌঁড়ে চলছে ‘গোল্ডেন বয়েজ’র মাশরাফি!

ঘড়ির কাটা টিক টিক করে এগিয়ে চলছে আপন গতিতে। হুট করে আমি থামিয়ে রাখতে চেষ্টা করলাম ঘড়িকে, কিন্তু দিন রাত্রি কিংবা নদীর স্রোত তো আর থামে না। নিজ গতিতে পৃথিবী তার নিজ কক্ষপথে ঘুরে বেড়ায়। থামানোর সাধ্যি কার? আমাদের সময় ও তেমন এগিয়ে চলতে লাগলো। আমরা কৈশোর ছেড়ে তারুন্যেয় পর্দাপন করবো করবো করছি। তখন আমাদের খেলাধুলার পরিমাণ কিছুটা কমে গিয়েছে। রোজকার ধরাবাঁধা রুটিন নেই, হুটহাট আড্ডায় কেউ একজন খেলার কথা তুললো তো অমনি মাঠে চলা। এমনি পর পর কয়েকদিন খেয়াল করলাম কালু অনুপস্থিত! গেলো কোথায়? পরে শুনলাম, ওর মায়ের তীব্র অসুস্থতা এই শহরের এক প্রান্তরে ওকে একটু খেয়ে পরে থাকতে দিলো না। নিয়তির লিখনে গন্তব্য হলো গ্রাম!

তখনো বাংলাদেশ ক্রিকেটে, এই দেশের জনতার কাছে, বিশ্বক্রিকেটে মাশরাফি এক গতিতারকার নাম। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে মহল্লার অলিতে গলিতে কান পাততেই ভেসে আসে মাশরাফির জয়গান। বল হাতে দৌঁড় শুরু করেন মাশরাফি, উল্লাসধ্বনিতে মাতে পুরো বাংলাদেশ “গুরু…”। এমনি একদিন খেলা দেখছি লালবাগের কোনো এক ইলেকট্রনিক্সের শো-রুমের সামনে। চোখের সামনে ভেসে উঠলো, লিকলিকে গড়নের একটা ছেলে ছোট্ট একটা লাঁফ দিয়ে দৌঁড়ে চলছে সামনের দিকে। গুডলেংথের বলটা ভয়াবহ গতিতে ভিতরে ডুকে ছত্রখান করে দিলো ব্যাটসম্যানের তেকাষ্ঠ। বত্রিশ পাটি দাঁত বের করে হাসছে ছেলেটা। হঠাৎ আমার ভ্রম ভাঙ্গলো আশেপাশের লোকগুলোর চিৎকারে। শো-রুমের টিভি স্ক্রিনে দেখাচ্ছে উল্লাসরত মাশরাফিকে অথচ আমি দেখছি লিকলিকে গড়নের বত্রিশ পাটি দাত বের করে হাসতে থাকা এক কিশোরকে!

পরিশিষ্ট:

বছর তিনেক পরের কথা। রুমে বসে বসে আমি বই পড়ছি। হূমায়ন আহমেদের “বোতলভূত”। হঠাৎ আব্বা রুমে প্রবেশ করলেন। কাছে এসে বললেন, পাশের বাসার কালুর মা ছিলো না? সে মারা গেছে রে।

আমি হতভম্ব হয়ে বই বন্ধ করে বসে আছি। স্মৃতির পাতা ওল্টাচ্ছে তার আপন গতিতে। হঠাৎ একটা পাতায় এসে আমার স্মৃতিশক্তি স্থির হয়ে গেলো:

– তোর বোলিং অ্যাকশনটা কার মতো বল দেখি?
– মাশরাফি, আমি মাশরাফি হতে চাই!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here