অপরিচিতা

আরিফুল হক বিজয়

0
158
bangla chotoder mojar golpo

– বিজয়! চলো, বিকেলে হাঁটতে বের হই।
– আচ্ছা, তুমি আসো!

আমার গন্তব্য ঠিক ঐ ‘আসো’ শব্দটার শেষ উচ্চারণ ও-কার অব্দি! এরপর আমার আর খোঁজ থাকে না। অদ্ভুতুড়ে এই বাউন্ডুলে মন ঠিক কোথায় কখন কিভাবে সময়ের প্রয়োজনে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিয়ে হাঁরিয়ে যায় সেটা নিজেও বুঝি না। তবে একেবারেই যে বুঝি না সেটা বললে ক্ষনিকের ভুল থেকেই যায়। বরং ইচ্ছে করেই এড়িয়ে চলি মায়াবী হাসির মেয়েটির অদ্ভুত মায়ার জাল!

মেয়েটির নাম নিশি! আমি আদর করে নাম দিয়েছিলাম, রাত্রি। কখনো কখনো অদ্ভুতভাবে ডেকে উঠতাম, ‘এই কুয়াশা, শোনো..।’ শীতের শিশিরে ভেজা ঘাসের উপর জমে থাকা বিন্দু বিন্দু সেই জলকণার মতোই মেয়েটিও যে ছিলো আমার ভীষণ প্রিয়। তবে মোম জমে জমে মধু হয়ে গড়িয়ে পড়েও যেমন প্রিয়তার অর্থ সহজে জানতে দেয় না, আমিও তেমন মেয়েটাকে জানতে দেইনি জমে থাকা অদ্ভুত মায়া।

কোনো এক কুয়াশাঘেরা শীতের সকাল। গ্রামের এলোমেলো মেঠোপথ ধরে অভ্যাসমতো হাঁটছি। হঠাৎ কোনো এক বাড়ির সামনে গিয়ে থমকে দাঁড়ালাম। অপরিচিতা! গ্রামের মেঠোপথ ধরে ধরে আমার রাজত্ব, রোজ বিকেলে মেয়েদের দল বেড়াতে বের হয় দলবেঁধে। কই? এই মেয়েকে তো কখনো দেখিনি। কিছুক্ষণ থমকে দাঁড়িয়ে আবার হাঁটা শুরু করলাম। এক পা করে সামনে এগোই আর এক পাঁক ঘুরে মাথায় এসে হাজির হয় একটাই প্রশ্ন, ‘কে এই মেয়ে?’

এভাবে রোজ হাঁটতাম আমি আর প্রায় রোজই দেখা যেত সে বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে দাত ব্রাশ করছে। একদিন মুখোমুখি হয়ে গেলো তিন রাস্তার মোড়ে। পাশ কাটিয়ে যাবো কি যাবো না ভেবে মুখ দিয়ে হুট করে প্রশ্নের তীর ছুটেই গেলো, ‘আপনার নামটা?’ উত্তর এলো সহজ সরল, ‘নিশি’। কথায় কথায় জানতে পারলাম, শীতের ছুটিতে নানাবাড়ীতে তার বেড়াতে আসা। তাই তো সচরাচর চোখে না পড়ে এবারই প্রথম চোখে পড়া।

এরপর থেকে নিশির সাথে আমার প্রায় কথা হতো; সকাল, বিকাল কিংবা হুটহাট। আমি ধীরে ধীরে পড়তে চেষ্টা করলাম মেয়েটাকে। কোনো প্যাঁচ নেই! সাধাসিধে চালচলনের সাথে গভীর কালো দুটি চোখে তার ভীষণ মায়া, পানপাতার মতো মায়াবী মুখমন্ডল আমার চিন্তাধারাকে আরো এক ধাপ এগিয়ে দিয়ে বুঝিয়ে দেয় মায়াজালে আটকে যাচ্ছি। নিশি হাসে, ঠিক বুঝে উঠতে পারি না। তবে এটুকু বুঝতে পারি, নিশি অন্যন্যা ধরনের কেউ, সাধারণে আবৃত অসাধারণ কেউ, যার হাসি আমাকে মোহমুগ্ধ করে মায়াজালে আটকে ফেলে।

বিলের জলে শাপলার বিচরণ? নিশিকে তুলে দেই। চাকচিক্যময় ভালোবাসা এই মেয়েকে ঠিক টানে না। কচুরিপানার ফুলও যে সৌন্দর্য্য ছড়ায় সেটা নিশিই হাত ধরে বুঝালো। কুয়াশার চাদর ভেদ করে ঠিক কতদূর গেলে জীবনের সার্থকতা আসতে পারে সেটাও নিশি হাত ধরে পথ মাড়িয়ে যেতে যেতে দেখিয়ে দিলো। গ্রাম্য জীবনে পল্লীবধূর রূপ শহুরে কৃত্রিমতাকে যে সহজেই হার মানাতে পারে সেটাও প্রথম এই মেয়েটাই আমাতে বিরাজমান করে দিলো।

ধীরে ধীরে নিশি আমাতে বিরাজমান হয়ে আমার রাত্রী হতে লাগলো। একদিন ঠিক এমনিই হাত ধরে পথ চলতে গিয়ে নিশি বলে বসলো, ‘এই যে হাত ধরে পথ চলতে চলতে তোমাতে একটা শান্তি অনুভব করি। এটাই কি ভালোবাসা?’
আমার ভ্রম ভাঙ্গে, অদ্ভুত এক অনুভূতি হতে থাকে, আমি স্থির হয়ে ওর মায়াবী মুখটার দিকে তাকিয়ে থাকি। এ কি! মেয়েটা হাসছে! কি সুন্দর করে। ওর কথার জবাবে শুধু মুখ দিয়ে বের হয়ে গিয়েছিলো, ‘আমার জানা নেই, নিশি।’

এরপর সময় কেটে গেলো তার নিজ পরিক্রমায়, আমি অভ্যস্ত হয়ে গেলাম শহুরে জীবনে, একপ্রকার ব্যস্ততায় ডুব দিলাম বলতে গেলে। যদিও ৩৬৫ দিনে কেবল দিন পচিশের জন্য গ্রামে আসা হয় কিন্তু নিশির আর দেখা পাই না। সময় মিলে না, দূরত্ব তৃতীয় পক্ষ হয়ে দাড়িয়ে যায়। অতঃপর সেদিন দাবদহের দুপুর, দাদার কবরস্থানের পাশে বসে আছি। চারদিকে সুনসান নীরবতা। দূর থেকে ঝাপসা চোখে দেখলাম কেউ একজন আসছে। কাছে আসতেই সেই চিরচেনা মুখটার চিরচেনা হাসি!

ঠিক কতদিন পর, কত মাস পর, কত সময় পর? আমার সঠিক জানা নেই। হিসাববিজ্ঞানের ছাত্র হয়েও সময়ের হিসাবের বেলায় আমি বড্ড অগোছালো, বড্ড কাঁচা। আমি ওর দিকে তাকিয়ে আছি। ও হাত ধরে টেনে নিয়ে চললো, হাঁটবে একসাথে। ধানক্ষেত দেখছি, চারদিকের সবুজের রূপ দেখছি, দেখছি নীল সাদায় আবৃত খোলা আকাশ আর হাঁটছি দু’জন। হঠাৎ সামনে উদয় হলো বিলের জলের অগনিত শাপলা, ভেসে থাকা গোলাকার পাতার উপর লাল সাদা শাপলা! নিশির ভীষন প্রিয় একটি ফুল।

আমার হাতটা ধরে থমকে দাঁড়ালো নিশি। শাপলাগুলোর দিকে তাকিয়ে সহজ সরল ভঙ্গিতে ওর প্রশ্ন, ‘আর দেখা দিলে না কেন?’ আমি কী জবাব দিবো? মায়াজাল ছিন্ন করে বহুদিন নিখোঁজ থেকে হঠাৎ ফেরার পর আদৌ কি কোনো জবাব থাকে? অদ্ভুতড়ে আমি খুঁজে পেলাম শুধু হুমায়ূন স্যারের একটি উক্তি— ‘ভালোবাসার মানুষদের খুব কাছে কখনো যেতে নেই নিশি।’ মেয়েটার চোখের দিকে তাকানোর সাহস আর আমার হলো না। আমি সামনে তাকিয়ে আছি। ভ্রম ভাঙ্গলো নিশির কন্ঠে, ‘যতদূর দৃষ্টি যায়, সব ঝাপসা, সব।’
অপরিচিতার চোখে জল, প্রতিটি নিঃশ্বাসে ভালোবাসার পবিত্রতা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here