পিশাচ

-আহমেদ ইশতিয়াক

0
280
bangla uponnash

তারপর এক বৃষ্টির রাতে আমার দেখা হলো কফিল উদ্দিনের সাথে।

সেই রাতে নিউমার্কেটের দিকে ছোট একটা চায়ের দোকানে বসে আমি বৃষ্টি দেখছিলাম। রাত তখন দশটার মত বাজে। দুর্যোগের রাত বলে মানুষজন নেই। কাস্টোমার বলতে আমি একাই। দোকানদার আমাকে এক কাপ চা আর একটা সিগারেট দিয়ে গুটিশুটি মেরে দোকানের এক কোণায় বসে ঝিমুচ্ছেন। আর আমি সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে গুনগুন করে গাইছি রবি ঠাকুরের সেই বিখ্যাত গান- আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদল দিনে।

এমন সময়ে হঠাৎ করেই এক মধ্যবয়স্ক লোক এসে ঢুকলেন। লোকটির পরনে পায়জামা পাঞ্জাবি। পাঞ্জাবির অবস্থা শোচনীয়। কেমন দলা পাকানো একটা ভাব। লোকটির চেহারাও অত্যন্ত মলিন। একমাথা ছোট ছোট কাঁচাপাকা চুল। চোখ দুটো যতটুকু সম্ভব কোটরের ভেতরে ঢুকে আছে। ভাঙা গাল। থুতনিতে কিছু ধূসর রঙের দাড়ি।

আমি বেঞ্চের এক কোণায় সরে কিছু জায়গা করে দিলাম। লোকটি বসলেন। তার শরীরের অনেকখানিই ভিজে গেছে। দেখলাম তিনি কেমন যেন হাঁপাচ্ছেন। মনে হয় বেশ কিছুটা পথ দৌড়ে এসেছেন।

হঠাৎ লোকটির চোখে চোখ পড়ে গেল। আমি ভদ্রতার খাতিরে সামান্য হেসে বললাম, আহা, ভিজে গেছেন দেখছি!

লোকটি হাসলেন। হাত দিয়ে মাথা ঝাড়তে ঝাড়তে বললেন, হ্যা,খুব বৃষ্টি।

লোকটার কথা বলার ভঙ্গি সুন্দর। উচ্চারণ স্পষ্ট। আমি মোটামুটি অবাক হয়ে গেলাম। এরকম একজন লোক এত সুন্দর করে কথা বলবে ভাবিনি।

লোকটি বললেন, এই বৃষ্টি সহজে থামবে না। বিপদ হলো।

আমি বললাম, আপনার বাসা কোথায়?

লোকটি বলল, লালবাগ।

সে তো ভালোই দূর! এই বৃষ্টির মধ্যে যাবেন কীভাবে?

লোকটি জবাব দিলেন না। একদৃষ্টিতে বাইরে তাকিয়ে থাকলেন। মনে হয় নিউমার্কেট থেকে লালবাগ যাওয়ার একটা উপায় খুঁজছেন। আমি মনে মনে বললাম, বাহ, ইন্টারেস্টিং ক্যারেক্টার!

লোকটি আমার দিকে না ফিরেই বললেন, ভাই, আমি কোন ইন্টারেস্টিং ক্যারেক্টার না।আমি থতমত খেয়ে গেলাম। আমি মনে মনে কী ভাবছি তা এই লোক বুঝলো কীভাবে? থট রিডিং টাইপের কিছু কি এই লোক জানে?

আমি এবার মোটামুটি কৌতুহল নিয়েই বললাম, ভাই আপনার নাম কী?

লোকটি এবার আমার দিকে ফিরলেন। বললেন, আমার নাম কফিল উদ্দিন।

আমি বললাম, কফিল ভাই,আপনি কী করেন?

কফিল উদ্দিন বেশ রহস্যময় ভঙ্গিতে হাসলেন। কিছু বললেন না।

আমি বললাম, কী ভাই? কী করেন তা বলতে সমস্যা আছে?

কফিল উদ্দিন বললেন, না। তবে বললে আপনি বিশ্বাস করবেন না।

বিশ্বাস করবো। বলুন।

কফিল উদ্দিন সামান্য কাশলেন। তারপর আবার বাইরের দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বললেন, ভাই,আমি কিছু করি না, আমি একজন পিশাচ।

প্রথমে মনে হলো আমি ভুল শুনেছি। পিশাচ আবার কী! আমি একরাশ অবিশ্বাস নিয়ে বললাম, কী বললেন? আপনি কী?

কফিল উদ্দিন এবারও বেশ নিচু গলায় বললেন, আমি একজন পিশাচ।

আমি প্রায় হেসেই ফেলেছিলাম। কোনরকমে হাসি চেপে বললাম,ও আচ্ছা! আপনি পিশাচ!

কফিল উদ্দিন আমার দিকে ফিরলেন। তার চোখমুখ কঠিন। তিনি বেশ কঠিন গলাতেই বললেন, আমি তো বলেছিলাম, আপনি আমার কথা বিশ্বাস করবেন না।

আমি কিছু বললাম না। এ লোক হয়তো অসুস্থ, পাগল। এই পাগলের সাথে কথা বলার কিছু নেই।

কফিল উদ্দিন দোকানদারের কাছ থেকে একটা সিগারেট চেয়ে নিলেন। তারপর সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললেন,আমি পাগল না ভাই। আমি সত্যিই পিশাচ।

আমি থতমত খেয়ে গেলাম। এই লোক সত্যিই থট রিডিং জানে! কী ভয়াবহ ব্যাপার!

কফিল উদ্দিন বৃষ্টি দেখতে দেখতে উদাস ভঙ্গিতে সিগারেট টানছেন। দোকানদারও আবার সেই আগের মত ঝিমুচ্ছেন। আমি একা বোকার মত বসে আছি। সব মিলিয়ে কেমন একটা রহস্যময় একটা পরিবেশ।

হঠাৎ কফিল উদ্দিন আমার দিকে ফিরলেন। বললেন, জানেন ভাই, আমি না পিশাচ হতে চাইনি। কিন্তু একদিন এমন একটা ঘটনা ঘটলো…

আমি নিজের অজান্তেই বলে ফেললাম, কী ঘটনা?

কফিল উদ্দিন আমার দিকে খানিকটা ঝুঁকে এসে বেশ আগ্রহ নিয়ে বললেন, ভাই, ঘটনাটা কাউকে বলতে পারি না। আমার খুব খারাপ লাগে। আপনি কি আমার ঘটনাটা বিস্তারিত শুনবেন?

কফিল উদ্দিনের কথা শুনে আমি মোটামুটি ভড়কে গেলাম। অবশ্য ভড়কে গেলেও সেটা বাইরে প্রকাশ করলাম না। আমি হাসিহাসি মুখ করে বললাম, বৃষ্টির দিন আছে। আপনার গল্প শুনতে মন্দ লাগবে না।

কফিল উদ্দিন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ভাই এটা গল্প না। সত্যি ঘটনা।

আমি বললাম, ও আচ্ছা!

কফিল উদ্দিন বললেন, বুঝেছি, আপনি প্রমাণ ছাড়া বিশ্বাস করবেন না। আপনার দোষ নেই। কোন মানুষই প্রমাণ ছাড়া কিছু বিশ্বাস করে না।

কথোপকথনের এই পর্যায়ে আমি সত্যি সত্যিই লোকটার প্রতি বেশ আগ্রহ বোধ করলাম। লোকটা হয়তো সত্যিই পাগল টাইপের। তবে পাগল হলেও বেশ গুছিয়ে কথা বলে। এই লোকের কথা শোনাই যায়। শুনলে তো আর ক্ষতি টতি হবে না।

আমি বললাম, কফিল ভাই, আপনি কি জন্ম থেকেই পিশাচ? না কি হঠাৎ করে হয়েছেন?

কফিল উদ্দিন বললেন, ভাই, রসিকতা করবেন না।

আমি বললাম, আরে না ভাই, রসিকতা না, আমি সত্যিই জানতে চাইছি!

কফিল উদ্দিন বললেন, না ভাই, আমি জন্ম থেকেই যে পিশাচ- ব্যাপারটা এরকম না।

তাহলে?

একদল পিশাচ আমাকে পিশাচ বানিয়েছেন।

কে বানিয়েছেন?

একদল পিশাচ।

ভাই, আমি কিছু বুঝতে পারছি না।

কফিল উদ্দিন উদাস গলায় বললেন, বুঝতে না পারারই কথা।

আমি এবার বেশ আগ্রহ নিয়ে বললাম, ভাই খুলে বলেন না!

আমার কথা শুনে কফিল উদ্দিন হাসলেন। লক্ষ্য করলাম ভদ্রলোকের হাসি বেশ সুন্দর। তার দাঁত অতিরিক্ত সাদা। কেমন ঝকঝক করছে। এখন আর তার চেহারা আগের মত মলিন লাগছে না। বরং বেশ সতেজ লাগছে।

কফিল উদ্দিন বললেন, শুনুন, মনযোগ দিয়ে শুনুন। একদিন, ঠিক এরকমই এক বৃষ্টির রাতে আমি আজিমপুর কবরস্থানের দিকে একটা বন্ধ দোকানের সামনে আটকা পড়ে গেলাম। সে কী উত্থাল পাত্থাল বৃষ্টি! রাস্তায় গোড়ালি সমান পানি জমে গেছে। বৃষ্টির তোড়ের কারণে রাস্তায় নামতে পারছি না। আবার দোকানের ছাউনির নিচে দাঁড়িয়ে থেকে যে লাভ হচ্ছে তাও না। বৃষ্টির ছাঁটে মোটামুটি পুরোটাই ভিজে গেছি।

এমন সময়ে লোডশেডিং হলো। পুরো এলাকাটাই অন্ধকার হয়ে গেল। কোথাও কোন শব্দ নেই। শুধু একটানা বৃষ্টির ঝমঝম ঝমঝম শব্দ। কেমন গা ছমছমে একটা পরিবেশ। আমি মনে মনে দোয়াদরুদ পড়ছি। কেমন যেন ভয়ভয় লাগছে। মনে হচ্ছে আমার আশেপাশেই অশুভ কিছু ঘুরঘুর করছে।

এমন সময় ঝপঝপ ঝপঝপ ধরণের একরকম শব্দ শুনতে পেলাম। শব্দটা ক্ষীণ কিন্তু স্পষ্ট। মনে হলো কয়েকজন লোক রাস্তার পানি পাড়িয়ে হেঁটে হেঁটে আসছে।

শব্দটা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। আর শব্দটা স্পষ্ট হওয়ার সাথে সাথে কেমন যেন গুনগুন গুনগুন ধরণের অন্যরকম একটা শব্দও শুনতে পাচ্ছি। মনে হচ্ছে লোকগুলো একসাথে কোরাসের মত করে কিছু একটা গাইছে।

ইতিমধ্যেই চোখে অন্ধকার সয়ে এসেছে। হঠাৎ দেখলাম পাঁচজন লোক ঝপঝপ শব্দ করে এদিকেই ধীরে ধীরে হেঁটে আসছে। তাদের সবার পরনেই কালো আলখাল্লার মতো পোশাক। তাদের শারীরিক আকৃতি পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে না। কেমন ছায়া মূর্তির মত দেখাচ্ছে। তাদের কোরাসও এবার একদম পরিষ্কার শুনলাম। তারা বলছে-

আমরা পিশাচ। আমরা পিশাচ।

রক্ত আমাদের খাদ্য।

জগতের সকল আনন্দ রক্তে।

হে মহান শয়তান, আপনি আমাদের আশীর্বাদ করুন।

এসব শুনে ভয়ে আমার কলিজা শুকিয়ে গেল। দৌড় দেয়ার একটা ইচ্ছা হলো। কিন্তু অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম আমি নড়াচড়া করতে পারছি না। হাত পা কেমন জমে গেছে। এদিকে লোকগুলো কাছে এসে পড়েছে। আবছা ভাবে দেখলাম প্রত্যেকের হাতেই শাবল কোদাল টাইপের কিছু একটা আছে।

লোকগুলো আমার সামনে এসে থেমে গেল। তাদের কোরাসও বন্ধ। অন্ধকারেও আমি বুঝতে পারলাম এরা সবাই আমার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আমি বলতে চাইলাম, কে আপনারা? কিন্তু বলতে পারলাম না। কথা গলার কাছে এসে আটকে গেল।

হঠাৎ তাদের একজন আমার মুখে টর্চের আলো ফেলল। উজ্জ্বল আলো। আলোতে আমার চোখ ধাঁধিয়ে গেল। আমি হাত দিয়ে চোখ ঢাকার চেষ্টা করলাম। আমার মনে হল অনন্তকাল তারা আমার মুখে টর্চ ধরে রেখেছে। একসময় আলো বন্ধ হলো। আমি চোখ কচলালাম। সামনের কিছুই দেখতে পারছি না। সব কেমন ঘুটঘুটে অন্ধকার। হঠাৎ ভারী একটা কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম। তাদের মধ্য থেকেই কেউ একজন আমাকে বললেন, হে পিশাচ, মহান শয়তান তোমাকে আশীর্বাদ করেছেন।

আমি ভয়ে কুঁকড়ে গেলাম। এদিকে আবার ধীরে ধীরে চোখে অন্ধকার সয়ে আসছে। আবছা আবছা দেখলাম তারা পাঁচজন এক সারিতে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। আমি বলতে চাইলাম, কে আপনারা, কী চান? কিন্তু এবারও বলতে পারলাম না। গলা দিয়ে কোন স্বরই বের হলো না। দেখলাম সারির ঠিক মধ্যের জন এক পা সামনে এগিয়ে এলেন। তারপর এক হাত উঁচু করে বললেন, মহান শয়তান আপনাকে আশীর্বাদ করেছেন।

আমি চুপ করে থাকলাম। কিছুই বললাম না। দেখলাম লোকটা তার হাত আমার দিকে বাড়িয়ে ধরলেন। বললেন, হে পিশাচ, আমার হাত ধরুন। আমি হাত ধরলাম।

কেন ধরলাম আমি জানি না। আমি আমার নিজের উপর কোন নিয়ন্ত্রণই রাখতে পারছি না। আমার মনে হচ্ছে অদৃশ্য কোন শক্তি আমাকে পরিচালিত করছে।

লোকটা বললেন, বলুন, আমি পিশাচ।

আমি বললাম, আমি পিশাচ।

লোকটি বললেন, বলুন, রক্ত আমাদের খাদ্য। জগতের সকল আনন্দ রক্তে।

আমি বললাম, রক্ত আমাদের খাদ্য। জগতের সকল আনন্দ রক্তে।

লোকটি এবার উচ্চস্বরে বললেন, বলুন, হে মহান শয়তান, আপনি আমাকে আশীর্বাদ করুন।

আমি বললাম, হে মহান শয়তান, আপনি আমাকে আশীর্বাদ করুন। এই কথা বলার সাথে সাথেই অদ্ভুত একটা ব্যাপার ঘটল। আমার সারা শরীর ঝনঝন ঝনঝন করে উঠল। মনে হলো আমার ভেতরের সব কিছু যেন উল্টেপাল্টে যাচ্ছে। আমি কেমন একটা ঘোরের মধ্যে চলে গেলাম। ঘোরের মধ্যেই দেখলাম কোত্থেকে একটা বাদুড় উড়ে এসে আমার হাত ধরে রাখা লোকটির কাঁধে বসল। লোকটা আমার হাত ছেড়ে দিলেন। তারপর বাদুড়টা ধরে আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, মহান শয়তান আপনার জন্যে এই উপহারটি পাঠিয়েছেন। আপনি এটি খান। পিশাচজন্মে এটিই আপনার প্রথম খাদ্য।

এইটুকু বলে কফিল উদ্দিন থামলেন। বললেন, আপনার চোখমুখ কেমন শুকনা লাগছে। আপনি একগ্লাস পানি খান।

কফিল উদ্দিন পানির কথা বলাতে খেয়াল হলো আমার গলা সত্যিই শুকিয়ে গেছে। সত্য মিথ্যা যাই হোক গল্পটা ভয়াবহ। আর তার গল্প বলার ভঙ্গিও বেশ সুন্দর। কফিল উদ্দিন যখন গল্পটা বলছিলেন তখন আমার মনে হচ্ছিল পুরো ঘটনাটাই যেন আমি চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি।

আমি জগ থেকে পানি নিতে নিতে বললাম, তারপর আপনি কী করলেন? বাদুড়টা খেয়ে ফেললেন?

কফিল উদ্দিন বললেন, ঘটনা তো কেবল শুরু হল। একটু জিরিয়ে নেই। ইয়ে ভাই, দেখুন, কী জোরে বৃষ্টি নেমেছে? এরকম বৃষ্টি হলেই আমার শুধু ভিজতে ইচ্ছা করে। ইয়ে, এক কাজ করি চলুন, দুজনে বৃষ্টিতে নেমে যাই। ভিজতে ভিজতেই বাকিটা না হয় শুনবেন। যাবেন?

আমার কাছে প্রস্তাবটা ইন্টারেস্টিং মনে হলো। তাছাড়া বেশ রাতও হয়ে গেছে। এই বৃষ্টি খুব সহজে থামবে বলে মনে হয় না। এরচেয়ে বরং বের হয়ে যাওয়াই ভালো। আর কেন যেন কফিল উদ্দিনের গল্পটাও শুনতে ইচ্ছা করছে। আমি বললাম, চলুন।

আমি আর কফিল উদ্দিন বৃষ্টিতে নেমে গেলাম। নেমে কিছুদূর গিয়েই বুঝলাম ভয়াবহ ভুল করে ফেলেছি। বৃষ্টির পানি অতিরিক্ত ঠাণ্ডা। কেমন সূচের মত গায়ে বিঁধে যাচ্ছে। আর বৃষ্টি পড়ছেও ঝমঝমিয়ে। আমি বললাম, কফিল ভাই, এই বৃষ্টির মধ্যে হাঁটা সম্ভব না!

কফিল উদ্দিন বললেন, ভিজেই তো গেছেন। এখন আর গা বাঁচিয়ে লাভ কী? তারচেয়ে হাঁটুন। একটু পর দেখবেন সয়ে গেছে।

আমি বললাম, চলুন তাহলে।

কফিল উদ্দিন বললেন, ভাই বাদুড়ের মাংস কিন্তু খুব তিতা।

আপনি কি সত্যিই বাদুড় খেয়েছিলেন?

হ্যা। কারণ আমি যে বাধা দেবো তখন আমার সেই শক্তি ছিলো না। তারা যা বলেছে আমি তাই করেছি।

আমি হতভম্ব গলায় বললাম, আপনি সত্যিই একটা জ্যান্ত বাদুড় খেয়ে ফেলেছেন!

কফিল উদ্দিন নির্বিকার গলায় বললেন, হ্যা। খুব তিতা।

আমার শরীর কেমন গুলিয়ে উঠল। তারপরেও আমি নিজেকে যথেষ্ট শান্ত রেখে বললাম, তারপর?

কফিল উদ্দিন বললেন, বাদুড়টা খাওয়ার পরেই রাস্তার পাশে বসে আমি বমি করে দিলাম। সারাটাক্ষনই কালো আলখাল্লা পরা লোকটা আমার কাঁধে হাত দিয়ে রাখল। বমি টমি করে একটু ধাতস্থ হয়ে বললাম, ভাই, আমার খুব পিপাসা পেয়েছে।

লোকটা বলল, আপনি আমাদের সাথে চলুন।

আমি বললাম, কোথায়?

লোকটি বলল, কবরস্থানে।

লোকটি হাত ধরে আমাকে দাঁড়া করালেন। বলল, চলুন। আমি লোকটার সাথে সাথে হাঁটতে থাকলাম। আমাদের পেছনে পেছনে বাকী চারজন। সবাই সেই আগের কোরাসটাই গুনগুন করে করে গাইছে। আশ্চর্যের ব্যাপার এবার আমিও তাদের সাথে গলা মেলালাম।

আমরা পিশাচ। আমরা পিশাচ।

রক্ত আমাদের খাদ্য।

জগতের সকল আনন্দ রক্তে।

হে মহান শয়তান, আপনি আমাদের আশীর্বাদ করুন।

একসময় আমরা কবরস্থানের গেটে চলে এলাম। গেটের সামনে দেখলাম ছাতা মাথায় এক লোক দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের দেখেই লোকটা প্রায় ছুটে এল। আমার হাত ধরা লোকটা বলল, রফিক, নতুন কবর কটা?

রফিক বলল, স্যার, আটটা কবর হইছে আজকে। আইজ মনের সুখে রক্ত খাইতে পারবেন।

আশ্চর্যের ব্যাপার কী জানেন ভাই, এই ধরণের কথা শুনেও আমার তখন ভয় লাগছে না। বরং কেমন যেন নেশা নেশা লাগছে। রক্ত খাওয়া! রক্ত খাওয়া যায়? ঘেন্না লাগে না? তবে বুক যেভাবে শুকিয়ে আছে, মনে হচ্ছে রক্ত পেলে আমিও সেটা ঢক ঢক করে খেয়ে ফেলবো।

কবরস্থানের দরজা খুলতে খুলতে রফিক বলল, স্যার, হেয় নতুন?

হ্যা, নতুন।

স্যার, স্লামালিকুম। আপনের কালা আলখাল্লা নাই দেইখাই বুঝতে পারছিলাম আপনে নতুন। একটা বানায়া নিয়েন। তয় একটা সমস্যা হইলো। পইরা আছেন সাদা। দূর থাইকা দেখা যাইবো।

আমার হাত ধরে থাকা লোকটি বলল, বৃষ্টির রাত আছে রফিক। দেখা যাবে না।

তুমি যাও। রফিক ভয়ে ভয়ে বলল, আচ্ছা স্যার। আপনেরা ভিতরে যান।

আমরা ছয়জন ভেতরে ঢুকলাম। ভেতরে ঢুকেই চারজন চারদিকে চলে গেল। আমার হাত ধরে থাকা লোকটা বলল, আপনার নাম কী?

আমি বললাম, কফিল।

লোকটা বলল, কফিল, আমার নাম মুহিত। আমাকে এই পাঁচজনের দলের লিডার বলতে পারেন।

আমি বললাম, মুহিত ভাই, আমার পিপাসা পেয়েছে।

মুহিত সাহেব বললেন, আমারো। চলুন আপনি আর আমি একসাথে খাবো। আপনি নতুন তো। তাজা কবর চিনে লাশ তুলতে পারবেন না।

আমি বললাম, লাশ তুলে কী হবে?

লাশ তুলে রক্ত খাওয়া হবে। তবে যে সে লাশের রক্ত খাওয়া যাবে না। কবর দিয়েছে চব্বিশ ঘণ্টা হয়নি এমন লাশ তুলে তার রক্ত খেতে হবে।

খেলে কী হবে?

মুহিত সাহেব বেশ শব্দ করেই হেসে বললেন, খেয়েই দেখুন। খেলেই বুঝতে পারবেন। আচ্ছা, আপনার কী ভয় লাগছে?

একটু আগ পর্যন্তও লাগছিলো। এখন কেন যেন আর লাগছে না।

আসুন।

মুহিত সাহেব একটা কবরের কাছে হঠাৎ থেমে গেলেন। আমার হাত ছেড়ে কবরের দিকে ঝুঁকে কী যেন দেখলেন। তারপর আমার দিকে তার কাঁধের শাবলটা এগিয়ে দিয়ে বললেন, নিন, কবরটা খুঁড়ুন। একটু কাজ করে খান। তাহলে আরো বেশি ভালো লাগবে।

আমি শাবলটা হাতে নিলাম। বিশ্বাস করুন, আমার তখন একটুও ভয় লাগছে না। উলটো কেমন যেন নেশা নেশা লাগছে। আমি কবরটা খুঁড়তে শুরু করলাম। ঝুম বৃষ্টির কারণে মাটি নরম হয়ে আছে। খুঁড়তে কষ্ট হচ্ছে না।

আমি কবর খুঁড়ছি, হঠাৎ মুহিত সাহেব বললেন, বাহ, আপনি তো পারেন দেখছি!

আমি বললাম, আমি গ্রামের ছেলে। মাটি টাটি কাটতে পারি।

তাই তো দেখছি। আজ আপনার ভাগ্য পরীক্ষা হবে। দেখা যাক লাশটা কোন কিশোরী মেয়ের হয় কি না।

কিশোরী মেয়ের হলে কী হবে!

রক্তটা খেলেই দেখবেন কী হবে! হাহাহা।যাই হোক, এক সময় কবর খোঁড়া শেষ হলো। কবরের বাঁশ পাটি সরাতে মুহিত সাহেব আমাকে সাহায্য করলেন। আমরা দুজনে ধরাধরি করে লাশটা তুলে আনলাম। কাফনের কাপড়টা সরিয়ে মুহিত সাহেব লাশের মুখে টর্চের আলো ফেললেন। লাশটা দেখেই- কীভাবে কী হলো জানিনা- আমার সারা শরীরে কেমন যেন উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল! উত্থাল পাত্থাল উত্তেজনা! অল্পবয়স্ক একটা মেয়ের লাশ। বয়স কত হবে? সতেরো আঠারো। আমি মুহিত সাহেবের দিকে তাকালাম। দেখলাম তার চোখদুটো চকচক চকচক করছে।

মুহিত সাহেব বললেন, বাহ কফিল! আপনি সত্যিই ভাগ্যবান।

আমি বললাম, রক্ত কীভাবে খাবো?

মুহিত সাহেব বললেন, অধৈর্য হয়ে গেছেন দেখছি! আচ্ছা ঠিক আছে খান। ঘাড়ের কাছটায় দাঁত বসিয়ে দিন।

আমি বললাম, দাঁত বসালেই কি রক্ত আসবে! আমার দাঁত তো আর কুকুরের দাঁতের মত চোখা না।

মুহিত সাহেব হেসে ফেললেন। বললেন, আপনার চারটে দাঁত ইতিমধ্যেই চোখা হয়ে গেছে। এখন থেকে প্রতি অমাবস্যার রাতে আপনার দাঁত চোখা হয়ে যাবে। আর দাঁত চোখা হলেই আপনি রক্তের জন্যে পাগল হয়ে যাবেন। আমাদের মত কবরস্থানে কবরস্থানে ঘুরে বেড়াবেন। ভোরের আলো ফুটলেই আপনি আবার স্বাভাবিক হয়ে যাবেন।

আমি আর কথা বাড়ালাম না। আমার সত্যিই কেমন যেন নেশা চেপে গেছে। আমি মেয়েটার ঘাড়ের কাছে কামড় বসিয়ে দিলাম। চারটা সরু ধারায় রক্ত ছিটকে ছিটকে বেড়িয়ে এল। এতদিন জানতাম রক্ত নোনতা হয়। কিন্তু কী আশ্চর্য! রক্তের ধারা আমার মুখে জিভে পড়তেইআমার মাথা ঝিমঝিম করে উঠলো। এত মিষ্টি! এত স্বাদ! আমি পাগলের মত হয়ে গেলাম। ঘন ঘন কামড় বসালাম মেয়েটার ঘাড়ে। রক্তের অজস্র ধারায় আমার চোখ মুখ মেখে গেলো। গরম গরম রক্ত। তবে একটা সমস্যা হলো। রক্ত বৃষ্টিতে ধুয়ে ধুয়ে যাচ্ছে। তখন আমি একটা কাজ করলাম। মেয়েটার কাফনের কাপড় পুরোটা খুলে এক হাতে মাথার উপর ধরে রাখলাম। দেখলাম এখন আগের চেয়ে আরামে খাওয়া যাচ্ছে।

আমার অবস্থা দেখে মুহিত সাহেব বললেন, আপনি এটা খেতে থাকেন। আমি আরেকটা দেখি। খাওয়া হলেও এখানেই থাকবেন। অন্য কোথাও যাবেন না। আমাদের খাওয়া শেষ হলে আমরা আপনাকে নিয়ে যাবো।…

এই পর্যন্ত বলার পর কফিল উদ্দিন থামলেন। এতক্ষণ আমি তার গল্পের মধ্যে এতটাই ঢুকে ছিলাম যে খেয়ালই করিনি কোন রাস্তা থেকে কোন রাস্তায় চলে এসেছি। কফিল উদ্দিন গল্প থামানোর পর একটু এদিক সেদিক তাকিয়েই বুঝতে পারলাম আমরা একটা গলির ভেতর আছি। গলিতে গোড়ালি সমান পানি জমে আছে।হঠাৎ আমার বুকটা কেমন ছলাৎ করে উঠল। আমি বললাম, কফিল ভাই, এখানেই কি সেই পিশাচদের সাথে আপনার দেখা হয়েছিলো?

কফিল উদ্দিন বললেন, হ্যা ওইতো সেই দোকানটা। এখানে আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম। চলুন ওখানে দাঁড়াই। অনেক তো ভিজলাম।

আমরা দুজন দোকানের সামনে দাঁড়ালাম। উপরের ছোট ছাউনিটা বৃষ্টি আটকাতে পারছে না। অবশ্য এখন আর আটকাতে পারলেই বা লাভ কী।

আমি বললাম, আজ অমাবস্যা, তাই না কফিল ভাই?

কফিল উদ্দিন বললেন, হু।

তারা কখন আসবেন?

এইতো কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে আসবেন।

আপনি কি এর আগেও মানুষকে এখানে ধরে এনেছেন?

হু।

তারপর পিশাচ বানিয়েছেন?

হু

কতজনকে এখন পর্যন্ত পিশাচ বানিয়েছেন?

আপনাকে নিয়ে দশজন হবে।

ও আচ্ছা।

কফিল উদ্দিন আমার দিকে খানিকটা ঝুঁকে এলেন। বললেন, একদম ভয় পাবেন না। চোখ বন্ধ করে বাদুড়টা গিলে ফেলবেন। জিহ্বায় যতটা সম্ভব কম লাগাবেন। ভয়ংকর তিতা।

আমি জবাব দিলাম না। হঠাৎ দেখলাম কফিল উদ্দিন কেমন শক্ত হয়ে গেলেন। ফিসফিস করে বললেন, ভাই, কিছু শুনতে পাচ্ছেন?

আমি কান খাড়া করলাম। অস্পষ্ট ধরণের একটা শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। ঝপঝপ ঝপঝপ। মনে হচ্ছে একদল লোক পানি পাড়িয়ে হেঁটে হেঁটে আসছে। শব্দটা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। আর শব্দটা স্পষ্ট হওয়ার সাথে সাথে কেমন যেন গুনগুন গুনগুন ধরণের অন্যরকম একটা শব্দও শুনতে পাচ্ছি।মনে হচ্ছে লোকগুলো একসাথে কোরাসের মত করে কিছু একটা গাইছে। কিছুক্ষণ পরেই লোকগুলোকে দেখতে পেলাম। তাদের সবার পরনেই কালো আলখাল্লার মতো পোশাক। তাদের শারীরিক আকৃতি পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে না। কেমন ছায়া মূর্তির মত দেখাচ্ছে। তাদের কোরাসটাও এবার একদম পরিষ্কার শুনলাম। তারা বলছে-

আমরা পিশাচ। আমরা পিশাচ।

রক্ত আমাদের খাদ্য।

জগতের সকল আনন্দ রক্তে।

হে মহান শয়তান, আপনি আমাদের আশীর্বাদ করুন।

আমি বললাম, কফিল ভাই, সবাই কালো আলখাল্লা পরে, আপনি পরেন না?

কফিল উদ্দিন বললেন, না ভাই। আসলে কালো আমার খুবই অপছন্দের একটা রঙ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here