পাঁচ লাখ টাকা

ইবরাহিম হানিয়া

0
203
new golpo

হাফিজ সাহেবের ফোন বাজছে। তিনি ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন। ফোন রিসিভ করতেই ওপাশে পরিচিত কণ্ঠ,
‘হাফিজ সাব কেমুন আছেন?’
‘ভালো। আপনি কেমন আছেন’? হাফিজ সাহেবের কথার সুরে উৎফুল্ল ভাব। এক মুহূর্ত থেমে আবার কথা বললেন, ‘হঠাৎ কী মনে করে?’
‘দুইডা বাচ্চা লাগবো।’
‘কত দিবেন?’
‘পাচ লাক।’
‘বারোটায় স্কুল ছুটি হবে। আপনার ইচ্ছামত দুইজন নিয়ে যায়েন। আর আগের কথাই, ধরা খাইলে আমি এর মধ্যে নাই। তখন আপনার সেফটি আপনার কাছে।’
‘আরে হাফিজ সাব, ওইডা আমারে কওন লাগব না। এইগুলা আমরা বালো বুজি। কাচা হাত নিয়া কি আর এই কামে নামি আমরা?’

পাঁচ লাখ টাকার স্বপ্নে বিভোর হয়ে ফোন রাখলেন হাফিজ সাহেব।

দৌলতপুর আদর্শ প্রাইমারি স্কুল। দীর্ঘ এগার বছর যাবৎ বিশ্বস্ততার সঙ্গে হাফিজ সাহেব এখানে প্রিন্সিপালের দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়ে আসছেন। এই স্কুলে অধ্যাপনার সুবাদে মাঝে মাঝে হাফিজ সাহেবের বড় বড় কিছু ইনকাম হয়। একটি মাত্র ফোন কলের মাধ্যমে। কয়েকটা কথার ইশারায়।

হাফিজ সাহেব বিল্ডিঙের কাজ ধরেছেন। বড় অংকের মামলা। অনেকদিন যাবৎ কাজ অসমাপ্ত পড়ে আছে। আজকের ফোনকলটা খুব জরুরী ছিলো। এবারের পাঁচ লাখ টাকা পেলে বিল্ডিঙের কাজটা ধরা যাবে। অফিসকক্ষে বসে হাফিজ সাহেব মোটামুটি পরিকল্পনাটা সেরে ফেললেন।

স্কুল ছুটি হয়েছে অনেক্ষণ। হাফিজ সাহেব অফিসক্ষে বসে মনিটরে কী একটা কাজ করছেন। খুব ব্যাস্ত দেখাচ্ছে তাঁকে। মনিটরের ভিতর বুদ হয়ে আছেন। কাজ করতে করতে একসময় হাফিজ সাহেবের চোখ ঢুলু ঢুলু করতে লাগল। মনিটরের সামনেই মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লেন। হঠাৎ ফোনের আওয়াজে হাফিজ সাহেবের কাঁচা ঘুম ভেঙে গেল। ফোন দিয়েছে তাঁর স্ত্রী। কিছুটা বিরক্তমুখে ফোন রিসিভ করলেন,
‘হ্যালো!’
‘এই শুনো! রাফিন সাফিন (হাফিজ সাহেবের দুই ছেলে) তো এখনো বাসায় আসলো না।’ স্ত্রীর কথাটা শুনে আচমকাই যেন হাফিজ সাহেবের ঘুম ভেঙে গেল। তড়াক করে ঘড়ির দিকে তাকালেন। তিনটা সতের বাজে। হাফিজ সাহেবের মনে অজানা এক আশংকা ভর করলো।
‘আচ্ছা, ফোন রাখো। দেখি কোথায় গেলো।’

হাফিজ সাহেব তড়িঘড়ি অফিস বন্ধ করে বাসায় চলে আসলেন। বিভিন্ন আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে খোঁজ করলেন। রাফিন সাফিনের সাথে ভালো সখ্যতা এমন কয়েকজন ছাত্রের বাসায়ও খোঁজ করলেন। কোথাও খুঁজে পেলেন না রাফিন সাফিনকে।

মাগরিবের আজান হয়ে গেছে কিছুক্ষণ হলো। এখনো ছেলেগুলোর বাসায় ফেরার নাম গন্ধ নেই। হাফিজ সাহেব হন্য হয়ে খুঁজে ফিরছেন। কোথাও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। হঠাৎ কী মনে করে সকালে ফোন দেয়া লোকটাকে ফোন দিলেন। ফোন রিসিভ করেই ওপাশ থেকে লোকটা বলল, ‘হাফিজ সাব! আপনের টেকা সময়মত পাইয়া যাইবেন।’
হাফিজ সাহেবের মেজাজ চড়ে গেলো। ছেলে খুঁজে পাচ্ছেন না আর এ বলছে টাকার কথা! হাফিজ সাহেব কণ্ঠটা স্বাভাবিক রেখে বললেন, ‘যেই দুই ছেলেকে ধরে নিয়েছেন ওরা দেখতে কেমন?’
‘দেখতে দুইজন সমবয়সীই। পিঠাপিঠি দুই ভাই। একটার নাম রাফিন…’
লোকটা কথা শেষ না করতেই হাফিজ সাহেব ভীষণ ভয়ঙ্করভাবে আঁতকে উঠলেন, ‘আরেকজনের নাম সাফিন?’ হাফিজ সাহেবের কণ্ঠে ভয়ের আভাস পেয়ে লোকটি তৎক্ষণাত বলল, ‘হ। ক্যা? কুনো সমস্যা?’
হাফিজ সাহেব এবার কাঁদো কাঁদো গলায় বললেন, ‘ওই দু’টো আমার ছেলে!’
লোকটি অনুতপ্ত কণ্ঠে বলল, ‘ছরি হাফিজ সাব! এতক্ষণে কাম শ্যাষ।’

হাফিজ সাহেব আর কোন কথা বলতে পারলেন না। ধীরে সুস্থে বাসায় এসে ঢুকলেন। বাসায় ঢুকতেই স্ত্রী এসে তাঁকে ধরলেন, ‘কী কোন খোঁজ পেলে?’ হাফিজ সাহেব কোন জবাব দিলেন না। চুপ করে রইলেন। এক ভয়ঙ্কর নিস্তব্ধতা তাঁকে ঘিরে ধরলো। হঠাৎ মেসেজের আওয়াজে সম্বিৎ ফিরলো হাফিজ সাহেবের। মেসেজটা এসেছে ব্যাংক থেকে। সেখানে ইংরেজিতে লেখা আছে, আপনার একাউন্টে এখন পাঁচ লাখ টাকা জমা হয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here