চিরকুট

আতিকুর রহমান

0
144
kujo burir golpo

ফোনটা রেখেই তাড়াহুড়ো করেই বেড়িয়ে পরলাম। অনেকদিন পর মেয়েটা কল দিয়েছিলো খুব বেশি কথাও হয়নি। সে দেখা করতে চায় এবং ঘন্টা দুয়েকের মধ্যেই। আরো বলেছে তার নাকি মন খারাপ তাই কোথাও একটু যেতে চায়।
মেয়েটার নাম হিমাদ্রিতা, আমি ডাকি হিমাদ্রী।

মন যে আমারও ভালো নেই সেটা তার জানা নেই। হিমাদ্রীর সাথে দেখা করলে ওর মন ভালো হবে কিনা জানিনা তবে আমার মন যে ভালো হবে সে ব্যাপারে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নাই। এই সুযোগোটা হারাতে চাই না৷ তাইতো বেড়িয়ে পড়েছি।

বাসে বসে বসে ভাবছিলাম হিমাদ্রীর মন ভালো করার কোন কিছু আছে কিনা৷ প্রথমেই মাথায় এলো নারিকেল গাছ। সারিবদ্ধ নারিকেল গাছ মেয়েটার ভীষন পছন্দের।

ঢাকাতে এক সাথে সারিবদ্ধ নারিকেল গাছ পাওয়া যাবে না।
আমার সামর্থ্য থাকলে হিমাদ্রীর জন্য একটা বাগান বানাতাম। যেখানে শুধু নারিকেল গাছ থাকতো। হিমাদ্রীর মন খারাপ হলে ওকে নিয়ে ঘুরতে যেতাম। ওর মন ভালো হতো, সাথে আমার মনও। কিন্তু সেগুলো সব কাল্পনিক স্বপ্ন।

অবশেষে দেখা হলো ওর সাথে। চেহারাটায় কেমন একটা আবছা ছাপ পরেছে। খুব চাপ যাচ্ছে সেটা বেশ বোঝা যাচ্ছে। চোখের নিচের কালো দাগগুলোও স্পষ্ট। প্রথমেই জানতে চাইলাম কোথায় যেতে চায় কি না। বলল সে জানে না।

আমিও কই যাবো ভাবতে চাই না। হাতের কাছেই দেখলাম একটা বাস। উঠে পরলাম।

ওর মন খারাপের তেমন কোন কারণ নেই। অকারণেই মন খারাপ। যা বুঝলাম অনেক দিকের ঝামেলায় আছে তাই একটু শ্রান্ত।

এই মন ভালো করা খুবই দুঃসাধ্য ব্যাপার। কেননা—

কারণের মন খারাপ
ভালোও হয় কারণে
অকারণের মন খারাপ
ভালোর কোন কারণ নেই।

একদম শেষের স্টপেজে নেমে পড়লাম। আমরা আবারো ফিরে যাবো আগের যায়গাতেই তাই আর দেরি না করে ফিরতি বাসে উঠে পড়লাম। কাজ বা কারণ কিছুই নেই। তাই এই আসা যাওয়া।

মেয়েটা অনেকটা ক্লান্ত। জীবনের পথ সুগম করতে করতেই হাঁপিয়ে উঠেছে খানিকটা।

যাইহোক, ইচ্ছা না করতেও ক্লান্তিতে মাথাটাকে আমার কাঁধে রেখে দিল। আমি খুব করে ওর ক্লান্তিটা অনুভব করতে পারছিলাম৷ এর পরের পুরোটা পথই একটা ছোট্ট শিশুর মতো কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়েছিলো।

আমার কয়েক বার নড়েচড়ে বসতে ইচ্ছে করছিলো, কিন্তু সাহস করে উঠতে পারিনি। বারবার মনে হচ্ছিল মেয়েটার ঘুমটা যদি ভেঙে যায় তাহলে আমি নিজেকে ক্ষমা করতে পারবো না।

আমাদের স্টপেজ এসে গেছে, কিন্তু নামলাম না। সত্যি বলতে ওকে ঘুম থেকে উঠাবো সেই ইচ্ছা বা সাহস কোন কোনটাই আমার নেই।

পরের স্টপেজে এসে হিমাদ্রীর ঘুম ভাঙলো। ও পরের স্টপেজে আসার কারণ জানতে চাইলো। তেমন কোন উত্তর দিতে পারিনি। আমতা আমতা করে কিছু একটা বলে নেমে পড়লাম।
প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেছে বাসায় ফিরতে হবে। রাতে বাসার বাইরে থাকার পারমিশন নেই। তাই হিমাদ্রীকে একটা রিকশা করে দিলাম। রিকশায় উঠেই ও আমাকে একটা চিরকুট দিলো। ভেতরে লেখা আছে কিছু একটা। আমি সেটাকে পকেটে নিয়ে দ্রুত চলে এলাম।

বাসায় যেতে যেতে ভাবছিলাম ওর কি মন খারাপ কমলো কিছুটা? নাকি আগের মতই? এসব ভাবতে ভাবতেই চিরকুটের কথা মাথায় এলো। খুব ইচ্ছে হচ্ছিলো খুলে পড়তে কিন্তু হিমাদ্রীর বারণ ছিল। বাসায় গিয়েই পড়তে হবে। হিমাদ্রীর সাথে দেখা করে বাসায় ফিরছি অথচ মনটা কেমন জানি অশান্ত। এ রকম হয়নি কখনো। জানি না কেন। চিরকুট এর লেখার জন্যই হয়তো।

এক প্রকার দৌড়ঝাঁপ করেই বাসায় ফিরলাম। বাসায় গিয়েই চিরকুটটা বের করে বার কয়েক পড়লাম। সেখানে হিমাদ্রীর হাতে হাতে স্পষ্ট অক্ষরে লেখা ছিলো—

ও হাতে হাত রাখলে মনে হয় যেন
সমস্ত ভরসা আমার ওখানেই,
ও কাঁধে মাথা রাখলেই মনে হয় যেন
সহস্র জনম কেটে যাবে এক পলকেই,
ও চোখে চোখ রাখলেই মনে হয় যেন
হৃদয় উজার করে বলছে— ভয় কিসের
তোর? আমি তো আছি……….

লেখাটায় এক অদ্ভুত যাদু আছে, যতই পড়ছি মন ভালো হয়ে যাচ্ছে। সেদিন সেই লেখাটা কতবার পড়েছি সেই হিসেব জানা নেই। পড়তে পড়তে কখন যে ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম বুঝতেই পারিনি।

সকালে ঘুম ভাঙলো একটু দেরি করেই। পরে মনে পড়লো আমি গত দুইদিনে বাসার বাইরেই যাইনি। সাদাত হোসাইনের “নিঃসঙ্গ নক্ষত্র” এর মধ্যেই ডুবে ছিলাম। ফোনটা হাতে নিয়ে দেখলাম কল লিস্টে এই দুদিনে কোন কল যোগ হয়নি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here