চিবুকের সেই তিলটি

শান্ত হাসিব

0
575
২৫ অক্টোবর
নীলক্ষেত
: আমি কি আপনাকে একটা বই গিফট করতে পারি?
চমকে উঠলাম। তবে চোহারাটা স্বাভাবিক রেখে আস্তে করে ঘুরে তাকালাম অনাহুত কণ্ঠ লক্ষ করে।
একটা ছেলে। এলোমেলো চুল, তবে উস্কুখুশকো নয়।  হ্যারি পটার গ্লাসের আড়ালে উঁকি দিচ্ছে বুদ্ধিদীপ্ত চোখযুগল।মুখে ৫/৬ দিনের না কামানো দাড়ি, কিংবা এটাই তার স্টাইল।ঠোটের কোণের মিষ্ট হাসিটা একজন মিশুক মানুষের পরিচর বহন করছে।  আর হাতে মাইকেল কোনেলি রচিত  “দ্য পোয়েট” এর সদ্য অনূদিত বাংলা কপি।
স্মার্ট!
: আমার মনে হয় আপনি জাহিদ হাসানের “ফিনিক্স ” বইটা পছন্দ করবেন।
আবার বলে উঠলো ছেলেটা।
এবার অবাক না হয়ে পারলাম না। গতকাল শেষ করা জাহিদ হাসানের প্রথম বই ” ঈশ্বরের মুখোশ” বইটার রেশ এখনো কাটেনি। পুরাই জাহিদ হাসানের ফ্যান হয়ে গেছি। এরপর থেকেত ফিনিক্স টা পড়ার জন্য উতলা হয়ে আছি। তবে মনে মনে ঠিক করেছিলাম ঈশ্বরের মুখোশের মত এটাও কেউ গিফট করলে তবেই পড়ব।  কিন্তু  এই ছেলে এটা জানল কিভাবে?
 জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে আছে ছেলেটি।
: বই যেহেতু না করার কোন অপশন নেই।
মুচকি হেসে বললাম ।
হাসিটা এবার প্রশস্ত হলো  তার। বিলটা পে করে হাটতে শুরু করল পাশাপাশি।
সারপ্রাইজ!  এই কারণেই মনে হয় এর নাম এটা। কোচিং এর ক্লাসটা শেষ করে এসেছিলাম নীলক্ষেত।  চির কিপ্টুশ আমি চেয়ে ছিলাম বই গিফট করে চমকে দিবো শয়তান নাদিয়াকে ।  আর এখন! নিজেই সারপ্রাইজ খেয়ে বসে আছি।
 পাঁচ টনি ট্রাকের ন্যায় ছেলেদের একশ হাত দূরত্বে অবস্থানকারী সেই আমিই কিনা আজ অপরিচিত এক ছেলে থেকে গিফট নিয়ে বসে আছি। এবং এই মুহূর্তে একই তালে হাটতেছি দুজন পাশাপাশি । কে যেনো বলেছিলো
অন্যরকম এক অনুভূতি সৃষ্টি করে মেয়েদের মনে”
: আমি শান্ত,
তাকালাম ছেলেটার দিকে। ঠোঁটের কোণে সে মায়াময় মিষ্টি হাসিটা।
: আমি তানহা তাবাস্সুম, অনার্স সেকেন্ড ইয়ার,  ইডেন
: আপনি নিশ্চয় এখন বলবেন না যে আপনি মার্কেটিং এর ছাত্রী ।
বলেই ফিক করে হেসে উঠল ছেলেটা।
কপট রাগের আড়ালে করুণ দৃষ্টিতে তাকালাম তার দিকে।
: সরি সরি আসলে যেভাবে গম্ভীর হয়ে আছেন আপনি তাই বললাম।
: ইকোনমিক্স
লজ্জামাখা কণ্ঠে বললাম।
:আর আমি ইংলিশে অনার্স করছি নর্থ সাউথ থেকে। লাস্ট ইয়ার
: গুড।
মুচকি হেসে তাকালো আমার দিকে। চোখ নামিয়ে নিলাম আমি। প্রশ্নটা করব কিনা ভাবতেছি।
: আচ্ছা আপনার বই গিফট দেওয়ার জন্য কি আমাকেই মিলল।
ভাবনা শেষ করার আগেই করে ফেললাম প্রশ্নটা।
:আসলে আমি আপনাকে গিফট করিনি। আমিত আপনার চিবুকের ছোট্ট কিউট তিলটা কে গিফট করলাম।
এবার তার হাসিতে যোগ না দিয়ে পারলাম না।
             ★★★★★
৩ নভেম্বর
বুড়িগঙ্গা নদী।
এলাকাটা বড্ড বেশী নিরব। সময়টা সন্ধার একটু আগে। চারদিকে পানি থৈ থে, মাঝে আমি আর সে। বসে আছি বুড়িগঙ্গা নদীতে ছোট্ট একটি নৌকায়।
: ধন্যবাদ বইটার জন্য
: আরে বাবা হলোত আর কত ধন্যবাদ দিবে?
: হি হি হি।  বইটা কিন্তু দারুণ
: হম বিশেষ করে খুনের বর্ণনাগুলোর তো কোন তুল নাই হয় না।
: যাও কি বলো। কি বিচ্ছিরি আর ভয়ঙ্কর।  মনে পরলেই ঘা রি রি করে উঠে।
: নৌকার খুনটা ছিলো বেস্ট ওফ দ্যা  বেস্ট। যাস্ট মাইন্ড ব্লোয়িং। কি জেনো নামটা?
: ফুলশয্যা।
আস্তে করে বললাম আমি।অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি তার দিকে।একটু আগের শান্ত এখন আর শান্ত নয়।  কেমন যেনো বিদঘুটে ভাব ফুটে উঠল তার চেহারায়। হঠাৎ করেই রক্ত নেশায় উতলে উঠল তার চোখ দুটি। ভয় পেলাম আমি। আতঙ্কিত হয়ে তাকালাম ফুলগুলোর দিকে। চোখের সামনে ভেসে উঠল ১৫০ পেইজের সেই বিভৎস খুনের বর্ণনাটি।
                  ************
ভিড় ঠেলে সামনে এগিয়ে যায় গোল ফ্রেমের চশমা চোখের ছেলেটি। অবশেষে জটলার সম্মুখভাগে আসত পারল সে। উৎসাহী মানুষগুলোর চোখ অনুসরণ করে তাকালো সামনের দিকে।
সুন্দর করে সাজানো একটি নৌকা। বাধা আছে বুড়িগঙ্গার এক তীরে।
আরেকটু সামনে এগিয়ে উঁকি মারল সে।
হা এবার নৌকার পাটাতন টা দেখা যাচ্ছে।
চারিদিকে ফুল। গাঁদা, গোলাপ,  রজনীগন্ধা, রক্তজবা, গন্ধরাজ। ফুলগুলোর মাঝে শোভা পাচ্ছে মৃতদেহটি।  চিবুকে তিলওয়ালা একটা মেয়ে!
ফিনিক্স পাখির ডানার ন্যায় হাতগুলো ছড়িয়ে রাখা পা দুটিও একই ভাবে ছড়ানো। তবে বিচ্ছিন্ন। শরীর থেকে আলাদা।  হাত পায়ের মতো মাথাটাও বিচ্ছিন্ন। গলার শিরাগুলো এখনো লাফাচ্ছে।  রক্তশূন্য চোখ দুটি যেনো কোটর ছেড়ে বেরিয়ে  আসবে। তবে ফর্সা ফ্যাকাসে চেহারাতে কালো তিলটা সুন্দর করে ফুটে উঠছে
গারো রক্তে লিখা “ফুলশয্যা” শব্দটা যেনো অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে ক্ষতবিক্ষত লাশের আতঙ্কিত চোখ দুটির দিকে।
লাশের পাশে পরে থাকা ছেড়া পাতাটার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি ফুটে উঠল ছেলেটির মুখে। পেইজ নাম্বার ১৫০!!!
               *★★★★★*
২৫ নভেম্বর
নীলক্ষেত।
: hi
বই এর  মাঝে ডুবে থাকা মেয়েটি হঠাৎ করেই চমকে উঠল। চোখে বিরক্তের ভাব ফুটিয়ে চিবুকের ছোট্ট তিলটাতে হাত বুলাতে বুলাতে পিছনে ফিরে তাকালো।
একটা ছেলে।
 মাথায় এলোমেলো চুল আর চোখে হ্যারি পটার গ্লাস।….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here