খুন কিংবা প্রেম

সাদিয়া সিদ্দিকা

1
271
I am not a sad clown. I am not a sad clown.

বারান্দায় মিতাকে দেখে বুক কেঁপে উঠলো আমার! মিতা…আমার প্রথম স্ত্রী!
মিতা গোসল করে রোদে চুল শুকোচ্ছে। চিকন কোমর বেয়ে টুপটুপ করে ঝর্ণাধারা বইছে। মিতা যখন আমার স্ত্রী ছিলো এই সময়টায় আমি ওর পেছন থেকে জাপটে ধরতাম। আজ আর সাহস পেলাম না। হচ্ছে কী এটা?
বাসায় কেউ নেই। আজকে আমাদের ফ্ল্যাটের মালিকের মেয়ের বিয়েতে গেছে সবাই। আমি কফি মেকারে কফি বানিয়ে রহস্য পত্রিকা খুঁজতে খুঁজতে কখন যে বারান্দায় এসেছি খেয়ালই করিনি। আমাদের বারান্দাটা সুন্দর। আক্ষরিক অর্থেই সুন্দর। ঝুলন্ত টবে বুনো ফুল ফুটেছে। পানি দেয়ার জন্য স্প্রে আছে। সময় পেলে আমি গাছে পানি স্প্রে করি। মিতার ক্যাকটাস গাছ খুব পছন্দ ছিলো। কিন্তু এখন আর এসব গাছ নেই। ইচ্ছে করেই আমি এসব সরিয়ে ফেলেছি। আমি মিতার পাশে গিয়ে বসলাম। মেয়েটা এখনো চুল শুকোচ্ছে! এই মেয়ের হেয়ার ফল হয় নাকি? চুল একেবারেই নেই মাথায়। কানের পাশে সেই তিলটা! এই তিল দেখেই আমি মিতাকে প্রপোজ করেছিলাম। আর মিতা? মিতা আমার রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে যুক্তি তর্ক করার কারণে প্রেমে পড়েছিলো। আমি মিতার পাশে বসে বললাম, কেনো এসেছো মিতা?
মিতা চুপ করে আছে। গলা দিয়ে গোঁগোঁ টাইপের শব্দ বের হচ্ছে। আমার অবাক হওয়ার কথা আমি অবাক হলাম না। মিতাকে বললাম, তোমার খুব কষ্ট হয়েছে সেদিন তাই না?
এবার মেয়েটা কথা বললো। খুব ধীর কণ্ঠে বললো, আবীর আমি তোমাকে জগতের কুৎসিত নিয়মেই হারিয়ে ফেলেছি। তুমি হেরেছো, আমি হারিয়েছি। আমার কোন কষ্ট হয়নি আবীর! তবে বিশ্বাস করো আমি তখনও ভেবেছি তুমি আমাকে হত্যা করতে পারো না! হত্যা করলেও আমি খুব শান্তিতে মরতাম জানো? কিন্তু তুমি তোমার যেসব বন্ধুদের দিয়ে আমায় আগে খুব করে নরক দেখিয়েছো এর কষ্ট আমি সত্যি মরে গিয়েও পাইনি! আমায় যখন কেটে টুকরো করছিলে তখনও আমার চোখ দুটো জীবন্ত ছিলো। আমার চোখ দুটো অবিশ্বাস আর ঘৃণায় পঁচে গলে গেছে। আমি তোমাকে ঘৃণা করতে পারিনি আবীর!
আমি চুপ করে রইলাম। ভার্সিটি শেষ হওয়ার দুই মাস পরেই আমরা বিয়ে করে ফেলি। কিন্তু কে জানতো পুরুষ মন যে মাঝে মধ্যে ভিন্ন স্বাদও চায়? জবে ঢুকতে না ঢুকতেই আমার কলিগের সাথে প্রেম হয়ে যায়। রুনু মেয়েটা সুন্দর, তবে মিতার মতো না। এছাড়া রুনু সাহিত্য বলতে কিছু বোঝে না। সাহিত্য মানে ওর কাছে কেবল পাঠ্যবইয়ের রবীন্দ্রনাথের “অপরিচিতা” গল্প। রুনুকে বিয়ে করার জন্য রীতিমতো আমার মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। মিতাকে ডিভোর্স দেয়ার মতো এবিলিটি আমার ছিলো না। এদিকে মিতার বাবার বাড়ি থেকেও চাপ আসছিলো মিতাকে নিয়ে যেনো আমি আমার কেনা ফ্ল্যাটে উঠি! এসব কিছু দিয়ে আর পারছিলাম না। একদিন হুট করেই সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেলি। রুনুকে আমার চাই-ই চাই! মিতাকে সরিয়ে দেয়ার এরচেয়ে ভালো কোন উপায় ছিলো না। আমাদেরই ক্লাসমেট রুবেল, শান্ত ওদেরকে রাতে চুপচাপ ডেকে এনে রুমে লক করে আমি ও রুমে কানে হেডফোন নিয়ে হাই ভলিয়্যুমে গান শুনতে লাগলাম। একটা পাষাণ মন আমার চেপে ধরেছিলো সেদিন। একটু পরে ও রুমে গিয়ে দেখি মিতা অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। খুব যত্ন করে তুলে কাগজ কাটার মতো কুটিকুটি করলাম, রাত দুপুরে সাইকো রোগীর মতো কেটে ফেললাম আমার প্রথম ভালোবাসাকে!
উফ! মাথায় কী যন্ত্রণা দিচ্ছে!! সেই মিতা এখন আমার সামনে বসে আছে। আমি কফির মগটা কাঁচের টেবিলে রেখে বললাম, তুমি তো মৃত কেন এসেছো তাহলে? মিতা বারান্দায় চোখ বুলিয়ে বললো, রুনুর বাচ্চা হয়েছে?
আমি মুখ নিচু করে বললাম, আমরা কখনো বাবা মা হতে পারবো না মিতা! মিতা একগাল হেসে বললো, তুমি কী জানতে আমরা বাবা মা হতে যাচ্ছিলাম? ওর দিকে অবাক হয়ে তাকানোর আগেই কলিংবেল বেজে উঠলো। রুনু চলে এসেছে। দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলতেই দেখি দারোয়ান বড় বড় নিশ্বাস নিয়ে বলছে, “বড় ভাই সর্বনাশ হইয়া গেছে! রুনু আপারে কারা জানি ধর্ষণ কইরা গেটের সামনে ফালায় রাইখা গেছে!”
-সাদিয়া সিদ্দিকা

1 COMMENT

  1. অসাধারণ লাগলো গল্পটা। আমি প্রথমে গল্পটা পড়া শুরু করেছিলাম শুধুমাত্র সময় কাটানোর জন্য। কিন্তু গল্পের শেষের বার্তা টি খুব পরিস্কার। যে খারাপ করে তার সাথে খারাপ হবেই।

    অনেক ধন্যবাদ আপনাকে সাদিয়া সিদ্দিকা এই রকম একটা গল্প লেখার জন্য।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here