অস্তিত্বহীন অভিশাপ

ধ্রূব খান

3
1187
bangla golpo book online reading
– ভিক্ষুক শালা। সারাদিন মানুষের কাছে হাত পেতে বেড়াস আর আসছিস ফুলপরীর কাছে। জানিস আমার কাস্টমার রা কে? আমি এখানকার সবচেয়ে সুন্দরী। যা এখান থেকে। ভিতরে ১০০-২০০ টাকায় যা পাবি ওগুলা দেখ। কিরে কথা কানে যাচ্ছে না? এখান থেকে যা। কাস্টমার নষ্ট করিস না। বাল কথাকার। এই বটতলায় আমি দাঁড়াই এটা তুই কেমনে জানলিরে?
                                                                                                  _______________________________
– গুড মর্নিং নাফি।
– বালের মর্নিং ।
– কেনো ?
– সকালে বটতলা থেকে ফোন আসছে।
– আবার লাশ ?
– জ্বী।
– কিভাবে মেরেছে ?
– আগের মতোই।
– কি রকম ?
– সূর্য তুমি ফাইল পড়ো নাই?
– না।
– গরুর নিহারীর একটা হাড্ডি না তোমার পিছন দিয়ে ঢুকানো উচিত।
– দিন দিন তোমার বাজে কথা বলার স্বভাব বাড়ছে।
– তোমাদের মতো আচোদারা থাকলে বাড়বেই। এদিকে এসো।
– সিগারেট হবে?
– স্টার।
– এতো নিচে নামলা কবে? লাগবে না।
– ধন্যবাদ, এবার এদিকে এসো।
– হুম।
– এ পর্যন্ত মোট ৪ টি খুন হয়েছে৷ সব কয়টি মহিলা এবং পেশায় বেশ্যা৷ প্রত্যেকটি খুন একি ভাবে করা হয়েছে৷ পোস্টমর্টেম রিপোর্ট বলে, প্রথমে হাত শক্ত একটি সবুজ রশি দিয়ে বাধা হয় তারপর জীবন্ত অবস্থাতেই তাদের চোখ গালানো হয়।
– খুন গুলো করে কিভাবে?
– ছুরি দিয়ে পোঁচ।
– সুন্দর৷
– কি সুন্দর?
– খুনের দিন- তারিখ এবং স্থান এবং ভিক্টিমদের ডিটেলস বলো তো।
– ১.পুস্পা রানী। ফেব্রুয়ারী, ২৫। পরনে ছিল নীল জামা। চুলের রং হালকা লাল। স্টেশনে লাশ পাওয়া যায়।
২. যমুনা যৌবনা। মার্চ, ৬। তার নিজেস্ব রুমে নগ্ন অবস্থায় পাওয়া যায়। যতদূর বোঝা যায় খদ্দের হিসেবেই তার কাছে এসেছিলো পরে রুমে ঢুকে খুন করে।
৩. আকাশী রত্না৷ মার্চ, ৩০। নেভি ব্লু জামা। দৌলতদিয়াতে ঢুকতে যেই ড্রেন টা পরে সেখানেই লাশ পাওয়া যায়৷
৪. ফুলপরী৷ এপ্রিল, ১৫। পরনে ছিল কালো জামা। বটতলায় পাওয়া যায়।
– দিনগুলো কিন্তু কাছাকাছি।
-হুম খুব জলদি কাজ সেরেছে৷
এই সময় বাইরে কেও একজন এসে বলতে লাগলো-“ভাইজান, কিছু দেন।”
নাফি ছুটে রুম থেকে বের হয়ে বললো। “যাও তো, আজাইরা। হাত পা সব ঠিক। কিছু করে খাও।”
রুমে ঢুকতেই সূর্য বলা শুরু করলো।
– কি হলো?
– আরে শালা ভিক্ষুক।
– পুরুষ মনে হলো বয়স্ক৷
– পুরুষই তো।
– এভাবে কেও মুরুব্বিদের সাথে কথা বলে?
– তাহলে কি যায়ে চুমু খাবো৷ শালা এই দেশে ভিক্ষা একটা ব্যবসা। না লাগে ক্যাপিটাল না লাগে পার্টনার। কিছু কৌশল লাগাও তাইলেই হইলো।
– ওটা মালুম মনিহারী৷
– কি?
– ওই ভিক্ষুকের নাম৷ কিছু দিন হলো এদিকে আসছে৷ নতুন মানুষ আসলে ভিক্ষা চায়৷ এমনি এদিকে খুব নাম ডাক। গাঁজা, বাবা সবই পাওয়া যায়।
– মানে! তাহলে ভিক্ষা করে কেন?
– আগেও ভিক্ষাই করতো। মায়া কাটাতে পারে না আগের পেশার। এক পা নষ্ট৷
– একটা ড্রাগ ডিলার এভাবে রাস্তায় ঘুরবে আর আমরা পাছায় আঙ্গুল ঢুকায়ে বসে থাকবো।
– অন্য কিছুও ঢুকাতে পারো। আমরা এখানে একটা সিরিয়াল কিলার কে খুজতে এসেছি, ড্রাগ ডিলার না।
– একটা জিনিস কিন্তু নিশ্চিত। নেক্সট খুনও একজন বেশ্যা হবে৷
– এটা সবাই বুজেছে৷ শালা, কিছু পতিতা খুন হচ্ছে দেখে কত রং৷
– বেশ্যারা মানুষ না! আজকে বেশ্যা খুন হচ্ছে কাল তোমার বউ হবে৷
– আমি অবিবাহিত।
– আমি বেশ্যার কথা বলেছি।
– মানে বলতে চাচ্ছো আমার বউ বেশ্যা হবে?
– সরি, আমাদের খাওয়ার জন্য গণেশ সাহেবের বাড়িতে যেতে হবে।
– এইটা আবার কে?
– শিল্পী। ছবি আকেন। আর পাশাপাশি থিয়েটারে নাটকে কাস্টদের সাজায়।
– ওরে বাবা৷ তাহলে তো যেতেই হয়৷
– চলো, রেডি হয়ে যাও।
নাফি বারান্দায় গেলো। একতলা বাসা৷ ভালোই সমস্যা হবে কিছুদিন৷ নাফি একটা সিগারেট ধরালো। বেনসন লাইট৷
সূর্য পাথরের মতো সেই সিগারেটের দিকে তাকিয়ে আছে৷
গণেশ বাবুর বাসায় খাবারের আয়োজন করার আসল কারণ তার বাসায় কাজের একটা ছেলে আছে। অন্য সবাই নিজের কাজ নিজে করে৷ আর এদিকে কেও কারো জন্য কিছু করতে চায় না৷ গণেশ বাবু লোকটা খুব কম কথা বলে৷ সারা বাসা ভরতি সরঞ্জাম,রং৷ সূর্য একটা দেয়ালের সামনে দাড়িয়ে আছে৷ ৫ টা ছবি৷ সবকটি ছবির নিচে পেইন্টারদের নাম লেখা। দেয়ালটার সামনে দাড়িয়ে একটা ছবি তুললো সূর্য। একটা ছবি সূর্যের খুবই পছন্দ হয়েছিলো৷
– গণেশ বাবু ৩ নাম্বার ছবি টা আপনি আমাকে আনিয়ে দিতে পারবেন ?
– হ্যা৷ আজ বিকেলেই পৌছে যাবে।
– ধন্যবাদ। দাম?
– লাগবে না।
– ওমা। আচ্ছা, ৪ পেইন্টারের নাম লাল কালি দিয়ে দাগানো কেনো?
– থিয়েটারে যেই নাটক হয় সেখানে কাস্টদের সাজাতে এই ৫ জন এর এই ৫ টা ছবির মতো সাজ দেওয়ার একটা স্বপ্ন বুনেছি। তো এই ৪ জন এর এই ৪ টি ছবির মতো সাজ দেওয়া শেষ। আর একটি বাকি। তাই এই ৪ নামে ডাক দেওয়া।
– তার মানে নেক্সট এই SALVADOR DALI এর ছবিটার মতোন করে সাজাবেন।
– আজ্ঞে, হ্যা।
– আপনি তো খুবই টেলেন্টেড৷
– ধন্যবাদ।
– এখনো কেউ এসব থিয়েটার দেখে?
– দৌলতদিয়া জায়গাটাকে আপনারা আরেক সিন সিটি বলতে পারেন৷ এখানে মানুষ পাপ থেকে মুক্তি পেতে থিয়েটারে আসে৷ আর এখানে ছোট যারা নাটক করে সবাই গরিব। নাটকের পর তাদের ১ সপ্তাহের খাবার দেই।
– ওয়াও৷ আপনি করেন কি?
– নারায়নগঞ্জের এক স্কুলে বাংলা পড়াই।
– বাহ, এতো বড় মাপের একজনের সাথে বসে খেতে পেরে আমি অনেক খুশি৷
– ছোট করলেন। আপনাদের কাজ কেমন চলছে?
– ভালো না। কোনো ক্লু নেই৷ না আসে কোনো ফিঙ্গার প্রিন্ট। মানে কিছুই বুঝতে পারছি না৷
– এদিকের কথা আর কি বলবো। ঢাকা শহরে একটি পাগল জামা কাপড় ছেড়া মহিলা ফুটপাতে থাকলে একমাস পর তাকে গর্ভবর্তী  অবস্থায় পাওয়া যায়। এদেশে কয়জন দোষীকে আপনি ধরবেন যেখানে গলিতে গলিতে অপরাধী।
– ঠিক বলেছেন৷ চলি আজ৷
– আসুন।
এরপরের দিনগুলো খানিকটা ঘুমিয়েই কেটে যায়। কারণ কোনো এভিডেন্স পাওয়া যায় না৷ এমনকি মানুষ কিছু বলেও না৷ তারা যেনো পতিতাকে মানুষই মনে করে না৷ আজ মে এর ১০ তারিখ। প্রায় ২৫ দিন হয়ে গেলো লাস্ট খুনের। ধরে নেওয়া হচ্ছে আর কোনো খুন হবে না৷ এতো দিন সময় আগের খুনে নেয় নি৷ সিক্রেট এজেন্ট হিসেবে তাদের কে শুধু চিনে গণেশ বাবু। কিছুদিন থিয়েটারেও নিয়ে গিয়েছিলেন। কাল এই সিন সিটিতে শেষ দিন। কাল রাতেই তারা রওনা হবে সেই ব্যস্ত নগরীতে।
১১ এপ্রিল। বিকেল ৫ টা।
দীঘির পানি এতো সচ্ছল কেনো। এই জায়গায় তো কোনো ভালো কাজ হয় না৷ তবুও কেন দীঘির পানি নিজেকে পাপী বানায় না৷ এই দীঘির পানি অবশ্য কেউ ব্যবহার করে না৷ একজন বাদে৷ কমলা জানপাখি৷ ওই তো এসেছে৷ সাদা একটা জামা পরে। হ্যা, আজরাতেই কাজ টা সারতে হবে৷ কি সুন্দর৷ এখানে রাতে মেয়েটার ভয় লাগে না। বেশ্যাদের আবার কিসের ভয়। ওদের তো আর রেপ হওয়ার ভয় নাই৷ কিন্তু ওতো রেপড হবেনা। হবে খুন৷ আজই ওর এই দীঘির পাশে কাটানো শেষ রাত৷
     __________________________
শেষবারের মতো রাতের খাবার খেতে গণেশ বাবুর বাসায় গেলো নাফি আর সূর্য। আজকে আবার খাওয়ার পর কিছুক্ষন আড্ডা হচ্ছে। হঠাৎ নাফি বলে উঠলো।
– গণেশ বাবু, আপনি তো থিয়েটারে SALVADOR এর মতো সাজ দিয়ে ফেলেছেন। তাও লাল দাগ দেন নি কেনো?
– আপনাদের সাথে এতো ভালো সময় কাটছিলো। ভুলেই গিয়েছি৷
এমন সময় গণেশ বাবু তার কাজের ছেলেটাকে বললো-” সুরেশ, রশিটা বাইরে রেখে আয়। মালুম যেনো ঘরে না ঢোকে। মেহমান আছে। বেটা দুদিন পর পর খালি রশি ছিড়ে ফেলে।”
রশিটা তাদের সামনে দিয়ে নেওয়ার সময় নাফি হঠাৎ আঁতকে উঠলো৷
– গণেশ বাবু, রশিটা কার?
– আমার ই। থিয়েটারে কাজে লাগে।
– কাকে দিচ্ছেন?
– ওইযে ভিক্ষুক। বেটা কাপড় শুকাতে দেওয়ার রশি পায় না। তাই আর কি আমার কাছে চায়। দেই রশি কিন্তু কিছুদিন পর ছিড়ে ফেলে৷
নাফি বলে উঠলো-“,সূর্য, মিশন শেষ। খুনি কে আশা করি বুঝতে পেরেছিস-” থানায় ফোন দে?”
নিস্তব্ধ পরিবেশ। হঠাৎ হঠাৎ সিগারেটের টানের শব্দ। এরপর নিরবতা৷ উপরে একটা হলুদ লাইট। সিগারেট টা টানছিল নাফি। সামনে বসে আছে সেই বিখ্যাত ড্রাগ ডিলাম মালুম মনিহারী।নাফি জিজ্ঞেস করলো।
– বাড়ি কোথায় আপনার?
– জানি না।
– ওহ আচ্ছা। আপনার নাম টা কে রেখেছে?
– জানি না।
– আপনার ছোটবেলার কথা কিছু মনে আছে?
– না
– ওরা কি আপনাকে অনেক মেরেছে?
– জানি না৷
– ওকে, বুঝলাম। বাড়ি কোথায় আপনার?
– রাজশাহী৷
– রাজশাহীর মিষ্টি আম পছন্দ করেন?
– মিষ্টি সবই পছন্দ করি।
– আপনার নাম কে রেখেছে?
– আব্বা৷
– কোথায় তিনি?
– মাইরা ফেলছি৷
– মানে?
– মানে জানি না৷
– ওরা কি খুব মেরেছে?
– দুই পিস বাবা গালাইছি। সকাল থেকে গাঁজা খাইতেছি৷ আমার গায়ে কোনো মাইর লাগে না৷
– ছোটবেলার কিছু কি মনে আছে?
– আছে৷ একটা মাইয়া আছিলো বাড়ির সামনে৷ আমার সব গুটি নিয়া গেছিলো। মন চাইতো মাইরা ফেলি৷
– এখনো মন চায়?
– যেই মাইয়া দেখি অই মাইয়ারেই মাইরা ফেলতে মন চায়৷
– ৪ টা লাশের হাত যেই রশি দিয়ে বাধা ছিলো সেটা আপনার ছিলো না?
– হয় আমার কাছেই আছে। সবুজ রশি৷
– খুন কি আপনে করেছেন?
– খুন! করতেও পারি৷ জানি না।
সূর্য আর নাফি দুজনেই বাসায় ফিরে এসেছে৷ নাফি সব গুছিয়ে নিচ্ছে। সূর্য এক সাইডে বসে আছে। হঠাৎ সূর্য বলে উঠলো৷
– ঘাপলা লাগছে৷
– কিসের ঘাপলা? শালা একটা শুয়োরের বাচ্চা মাল খায়ে খুন করছে। আর তুমি বলছো ঘাপলা আছে? তাও আবার স্বীকার করেছে৷
– বুঝতে পারছিনা৷ আচ্ছা ছবি টা দাও তো। গণেশ বাবু পাঠানোর পর খুলেই দেখা হয় নি।
সূর্য ছবি টার প্যাকেট খুললো। কি সুন্দর একটা মেয়ের ছবি৷ নিচে লিখা VINCENT VAN GOACH – BORN : MARCH 30,1854 DIED: JULY 29,1890
জন্মদিনে টা দেখে হালকা খটকা লাগলো। এরপর ল্যাপটপ নিয়ে বসলো। বের করলো দেয়ালের সামনে দাড়ানো ছবিটা।
আধা ঘন্টা পর থানায় ফোন দিয়ে বললো -” মালুম নির্দোষ। ছেড়ে দিন।”
নাফি ছুটে বারান্দায় আসলো।
– মানে। তুমি কি পাগল হয়ে গেছো?
– খুনি অন্য কেও এবং কে সেটাও তোমাকে বলছি। প্রথমত বলি একটা খোড়া মাতাল লোক কখনোই এত নিপুণভাবে খুন করতে পারবে না৷ ব্যাপার টা আমাদের বোঝা উচিৎ ছিলো।
– এখন বলো।
– খুনের ৫ টা ডেট বলো।
– ফেব্রুয়ারী ২৫, মার্চ ৬,মার্চ ৩০,এপ্রিল ১৫।
– আমার এই ছবিটি দেখো। ৫ জন পেইন্টারের নাম যথাক্রমে
1.Auguste Renoir যার জন্মদিন ২৫ ফেব্রুয়ারী। তার আকা ছবিটি খেয়াল করো। নীল জামা পরা লাল চুলের মেয়ে। প্রথম খুন পুষ্পা রানীর লাশ নীল জামা এবং লাল চুলে পাওয়া যায়।
২. Michelangelo যার জন্মদিন ৬ মার্চ। তার ছবিটি ছিলো একটা নগ্ন মহিলার। দ্বিতীয় খুন যমুনা যৌবনা। যার লাশ নগ্ন অবস্থাতেই পাওয়া যায়।
৩. Vincent van gogh যার জন্মদিন ৩০ মার্চ। তার ছবির মেয়েটি নেভি ব্লু জামায়। আকাশী রত্নাকে পাওয়া যায় নেভি ব্লু জামায়।
৪. Leonardo da Vinci যার জন্মদিন এপ্রিল ১৫। মোনালিসার জামার রং কালো। ফুলপরীর লাশ কালো জামা পরা অবস্থায় পাওয়া যায়৷
– তার মানে খুন করেছে গণেশ বাবু। এখন জলদি পাঁচ নম্বর পেইন্টারের জন্মদিন বের করো।
– ঠিক বলেছো৷
ল্যাপটপে সার্চ দিতেই এসে পড়লো।
Salvador Dali
Born : May 11
দেখেই নাফি আর সূর্যের আঁতকে উঠলো৷ ফোন করলো থানায় এবং পুলিশ ফোর্সকে জায়গায় জায়গায় সার্চ করতে বললো। Salvador এর ছবির মেয়েটি সাদা জামা পরা এবং হালকা সাদা চুল৷ যা সবাইকে জানিয়ে দেওয়া হলো। যেই পতিতাকে এরকম আউট ফিটে দেখা যাবে তাদের কে যেনো সিভিলিয়ানরা ফলো করে৷
       ______________________
দীঘির ধারে বসে আছে এক সুন্দরী রমনী। নাম তার কমলা জানপাখি। হঠাৎ কমলা বলে উঠলো।
– কিগো? আজ শরীরে অনেক ধকল গেছে। আজ আর এসো না। যদি চাও তবে বসে দুটো কথা কই। এমন চুপ করে আছো কেন? এই গরমে চাদর গায়ে কেন? পুলিশের মার খেয়ে কি জ্বর বাধালে নাকি? হাতে কি সাপ নাকি রশি? আধারে বোঝাও তো যাচ্ছে না। একটা জিনিস খেয়াল করেছো মালুম। তোমার আর আমাদের অবস্থা কিন্তু একি। ওকি, আসো এখানে। বসো৷
এমন সময় নাফি আর সূর্য আসলো এবং পিস্তল উচিয়ে ধরলো এবং বলে উঠলো-“গণেশ বাবু, দিন শেষ। ছুরি এবং রশি ফেলে হাত উঠান।” যা দেখে কমলা দৌড় দিলো। হাত তুলে পেছনে তাকাতেই নাফি এবং সূর্য আঁতকে উঠলো। এ কি করে সম্ভব৷ সামনে যিনি দাড়িয়ে আছেন তিনি কি মালুম ভিক্ষুকের জময ভাই!
        _____________________________
– এতক্ষনে হয়তো জেনে গেছেন মালুম মনিহারীর কোনো জময ভাই নাই। গণেশ বাবুও নিশ্চয়ই এসে পড়েছেন। আসলে আমি কোনো কিছু দেখে অনেক সহজে শিখতে পারি। গণেশ বাবু যখন সবাইকে বিভিন্ন সাজে সাজাতো তখন সেই জ্ঞানটুকু আমিও আয়ত্ত করে নেই৷ আমাকে এখন বললে এখনি আপনাকে গণেশ বাবুর মতো সাজিয়ে দিতে পারবো। কেউ চিনবে না। গণেশ বাবু একবার এক মেয়েকে মোনালিসা বানিয়েছিলো। সে যখন স্টেজে উঠে সবাই আঁতকে উঠেছিলো। ভেবেছিল আসলেই মোনালিসা। আমার ক্ষেত্রেও তাই। আমিও পারবো। তাই আমার মালুম ভিক্ষুকের মতো বেশ ধরতে কোনো কষ্টই হয় নি৷
– খুন গুলো যে ডেট হিসাব করে মেরেছো সেগুলো……
– রাতে আমি গণেশ বাবুর বাড়িতে সেই ৫ ছবিওয়ালা দেয়ালের সামনে ঘুমাতেন। সারারাত মনে হতো ছবি গুলো আমার সাথে কথা বলছে। ছবি গুলোর নিচে পেইন্টারদের নাম ও জন্মদিন লিখা ছিলো৷ সেই দিন গুলোতে বের হলে ছবির জামার রঙে কাউকে জামা পরা দেখলে মনে হতো এটা মনে হয় সেই ছবির ই মেয়েটা।
– পড়াশুনা করেছো?
– জ্বী, গণেশ বাবুই আমাকে পড়ান৷ আর ক্লাস ৭ পর্যন্ত পরেছি৷
– তোমার এরকম মেয়ে বিদ্বেষী হওয়ার কারণ কি? আর তুমি যাদের মেরেছো। সবাই ছিলো পতিতা৷
– স্যার, এক ঘটনা শুনবেন?
– হুম, বলো।
– আমি ছোট থেকে ছিলাম বাবার কাছে। মাকে দেখি নাই৷ বাবা আর আমি একটা ছোট হোটেল চালাইতাম। বাবা প্রায়ই ওই পতিতালয়ে যাইতো৷ একদিন বাবাকে মিথ্যা মামলায় পুলিশ ধরে নিয়ে যায়৷ আমি তখন একাই দোকান চালাই।একাই পড়াশুনা করি। যখন ক্লাস সেভেনে পড়ি তখন স্কুল থেকে আমাকে বের করে দেয়৷ বলা হয় জেলে থাকা মানুষের ছেলের সাথে কেও পড়তে চায় না৷ কষ্টে আমি ড্রাগস নেওয়া শুরু করি। দুবছর পর আমি সেই পতিতালয়ে যাওয়াও শুরু করি। সেখানে আমার দেখা হয় রুমানা নামে একজনের সাথে। ওর সাথেই আমি থাকতাম সেখানে গেলে। জীবনে কখনো কোনো মেয়ের দিকে তাকাইনি৷ রুমানার সাথের সখ্যতাটা ভালোবাসায় রুপ নেয় কিছুদিনেই। রুমানার মাও এই জায়গারই একজন। রুমানা ছিল জারজ। একদিন ওর রুমে আমি আমার বাবার পাসপোর্ট সাইজের ছবি পাই। তাকে জিজ্ঞেস করতে সে বলে উঠে -” ওনার জন্যই তো আজ আমার এ অবস্থা৷ এই শালাই আমার মায়ের পেটে আমাকে দিয়ে গেছে।” এরপর আর যায়নি সেখানে।
– সে আপনার বোন হয়৷
– হুম, যাকে বলে step sister। আমি আর তাকাইনি সেদিকে৷ একবার স্টেশনে ট্রেনের নিচে ঝাপ দিতে নেই। সে সময় গণেশ বাবু আমাকে নিয়ে যান। তার সাথে রাখেন৷
– শুনো। তুমি একজন অসুস্থ রোগী৷ তোমার যেই রোগ টা হয়েছে একে বলা হয় “Antisocial personality disorder” যেটাতে মানুষ কোনো একটা কিছু কে কেন্দ্র করে ভায়োলেন্স ক্রিয়েট করে। যেমন তুমি করেছো ছবিকে কেন্দ্র করে। ৩০০ ধারানুযায়ী একজন মানষিক বিকারস্ত ব্যক্তিকে যাবৎ কারাদন্ড দেওয়া হয়। তোমাকে সেরকম কোনো শাস্তি দেওয়া হবে। তোমার নাম টা যেনো কি?
– সুরেশ, সুরেশ চন্দ্র দাস৷।
– তুমি কি কিছু বলতে চাও?
– স্যার, নরকের আগুনে জ্বলতে থাকা কারো যদি আগুনে জ্বলার ক্ষমতা আমি দূর করে দেই তাহলে তো সে ছাই হয়ে যাবে এরপর যদি তাকে আবার জীবন দেই তাহলে কি সে স্বর্গে যাবে না?
– ধরে নাও যাবে।
– স্যার, আমি কখনো জেলে কষ্টে থাকবো না। কারণ আমি যাদের মেরেছি তারা এখন কোথায় আছে জানিনা কিন্তু দুনিয়া নামক নরকে নেই। সেটা জানি।
– ভালো থেকো। আসি।
বাইরে নাফি আর সূর্যের জন্য জিপ অপেক্ষা করছে। গাড়ির কাছে যেতে মনে হলো কেউ থানার বাইরে আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে। নাফি তাকালো। হ্যাঁ, কমলা মেয়েটা। আরে, একটা মেয়ের চোখ এতো সুন্দর হয় কিরে! চোখ তো খুলে নিয়ে যেতে ইচ্ছা করছে। মেয়েটা মনে হচ্ছে হাসি দিলো। কৃতজ্ঞতার হাসি! কিছুক্ষণ পর মনে হলো মেয়েটা আসলে কাঁদছে। চাঁদের আলো পরাতে মনে হচ্ছে হাসি দিচ্ছে। পুরা মানুষের মত হাসি। আজব তো, এরকম কেন মনে হলো! তারা তো মানুষই।

3 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here