অতৃপ্ত অভিলাষ

0
1972

সুদাদ আনোয়ার সাহিল

 

অপরাহ্নের সূর্যের কিরণ তীব্র ভাবে পথচারীদের ঘাম ঝরাচ্ছে। রোদের তাপে ক্লান্ত হকারদের গুঞ্জন ক্রমশ কমে আসছে। নভেম্বর মাস যদিও শেষ হবার পথে তবুও সূর্যের তেজ যেন কিছুতেই কমছে না। রাস্তার দু-পাশের দেবদারু গাছগুলোর সুউচ্চ শাখা-প্রশাখা প্রশান্তি দিতে ব্যার্থ হচ্ছে। একেবারেই নাজেহাল অবস্থা। কিন্তএকদল কিশোর কে সূর্যের এই তীব্র তেজ যেন কিছুতেই কাবু করতে পারছে না। দীর্ঘ  এক মাস পরীক্ষার পর তাদের সামনে এখন দিগন্তে বাধ ভাঙা উল্লাস। তারা যেন আজ নীল আকাশের মুক্ত পাখি।

– কিরে আদ্রিত পরীক্ষায় তো ভালোই কোপ দিছিস মনে হয়?

-না দেই না তবে এখন তোরে এমন একটা কোপ দিমু যাতে কোনো দিন বাচ্চার বাপ না হয়তে পারোস।

-তুই না দিন দিন অনেক বেশি ফাজিল হয়ে যাচ্ছিস

– মিরান আমি ভুল কি বললাম, এমনিতেই যে মেয়ের পিছে ঘুরোছ তার বাচ্চার বাপ কোনোদিন হইতে পারবিনা,  মামা হয়েই থাকতে হইবো।

– তোরা থামবি। কালকে  সকাল আটটায় বড় মাঠে ক্রিকেট টুর্নামেন্ট আছে  আমারা সবাই থাকবো তুই থাকবে তো আদ্রিত?

– মাহমুদ তোরা সেটা কালকেই দেখাতে পারবি ।

– তোর না  হেয়ালি করা টা একটা অভ্যাসে পরিনিত হচ্ছে।

-আরে কি বলিস হাজার হাজার টাকার ডিটেকটিভ বইয়ের সদ ব্যবহার  আদ্রিত করবে না  সেটা কি হতে পারে?

– আর যাই করি রিজু, আমিতো তোর মতো আর স্কুলের বাথরুমে যাইয়া আকিজ বিড়ি টানি না।

– ওই  আবাল তই কি বুঝবি রে আকিজের মহিমা।

– ভাই  মাফ চাই আমি, আকিজ  মহিমা বুঝতে চাই না।

ভোর ৬.৩০,
পূর্ব আকাশে সূর্য করমচা ফুলের রং ধারণ করেছে।আদ্রিত তার স্কুলের ব্যাগটায় টেসে টেসে কাপড় ভরছে। তার সাথে গোটা পাঁচেক ডিটেকটিভ বই। পরীক্ষার কারনে দীর্ঘ একটি বছর নানা বাড়ি যায়নি। আদ্রিত বাসা থেকে বের হয়ে পিচ ঢালা রাস্তা পেরিয়ে ব্রিজের  সাথের ইট বিছানো রাস্তা দিয়ে হেটে ব্রিজ পার হয়ে মেন রাস্তায় গিয়ে একটা লকর – ঝকর মার্কা বাসে উঠলো। বাসে উঠে মাঝ বরাবর জানালার ধারের সিটটা তে বসে পরলো। বাসের অর্ধেক খোলা জানালা দিয়ে হিম শীতল বাতাস এসে তার মাথার বড় চুল গুলোকে  ক্রমশ দোল খাওয়াতে লাগলো। আদ্রিত তখন কানে হেডফোন লাগিয়ে তার ফেভারিট গানের প্লে লিস্ট টা থেকে গান শুনছে। আর জানালা দিয়ে নীল আকাশে সূর্যের খেলা দেখছে। লোকাল বাস, দেড় ঘন্টার পথ আড়াই  ঘন্টা লাগে। অবশেষে বাস গুলিস্তানে পৌঁছালো। চার দিকে মানুষের ভিড়ে  মধ্যে  সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যাস্ত।

– ওই মামা এ.জি.বি কলোনী কাঁচা বাজার যাবা??

– হ যামু , নব্বই টাকা।

– তোমার পিছন দিয়ে দিব। পঞ্চাশ টাকা গেলে যাবা না গেলে নাই।

– আহেন যামু।

এ.জি.বি কলোনি আদ্রিতের নানা বাড়ি। সেই বিট্রিশ আমল থেকে তার নানা রা এখানেই বসবাস করে আসছে। তার নানার বাবা পাকিস্তানের করাচিতে ডাক বিভাগের কর্মকর্তা ছিলেন। তখন তিনি চাকুরির সূত্রে এই কলোনিতে কোয়ার্টার পেয়েছিলেন।  তার অবসরের পর আদ্রিতের নানা এ.জি. তে অডিটর পদে চাকুরি পান যথাক্রমে কোয়ার্টার তার নামে আসে। ৭২ সালে আদ্রিতের নানী এই কলোনীতে বউ হয়ে আসেন। তখন কলোনিতে এতগুলো বিল্ডিং ছিলোনা। দুই- তিন টা হবে। তবে তার নানার বিয়ের পনের বছর পর তার নানা মারা যান। আদ্রিতের নানী নিজ যোগ্যতায় একটা সরকারি পান। তাই এই কলোনির সাথে তাদের বহুকালের সম্পর্ক। আর আদ্রিত বড় হবার পর এগুলো এতবার সবার মুখে শুনেছে তাই একরকম মুখস্তই হয়ে গেছে। প্রায় সকাল দশটা, কলোনীর সব চাকুরীজীবিরা সকালের বাজার করে নাস্তা খেয়ে টিফিনবাক্স নিয়ে আফিসে গেছেন।আর মহিলারা বহুবিধ কাজে ব্যাস্ত। কেউ দুপুরের রান্নার আয়োজন করছে, কেউ আবার সেগুন কাঠের সোফায় বসে পা দুলিয়ে বাসি হিন্দি সিরিয়াল দেখছে, যাদের স্বামী অতি ব্যাস্ততার কারনে সকালে বাজার করতে পরেনি, তারা আবার বাজারের ব্যাগ হাতে বাজার থেকে ঘরে ফিরছে  হঠাৎ  বি -২৪ নাম্বার বিল্ডিং এর জি – ৩ নাম্বার ফ্ল্যাটে খট খট আওয়াজে দরজার ওপাশ থেকে কাজের মেয়ে টুনি তীক্ষ্ণ কন্ঠে  বলছে,

– মাফ করেন, খয়রাত নাই।

আদ্রিত আবার খট খট দিতে দিতে বলতে লাগলো,

– ওই টুনি দরজা খোল আমি আদ্রিত।

– ও মামা আপনে !

– হ্যা আমি, তুই আমাকে মাফ করেন বললি কেন?

– আসলে মামা কলোনি তে ফকিরের উৎপাত দিন দিন বাইরা যাইতাছে।

– তাই নাকি?

– হ মামা কি আর কমু আপনারে। কয়েক মাস আগে ৫ নাম্বার বিল্ডিং এর  কারে জানি ফকির সাইজা অজ্ঞান কইরা সব কিছু  নিয়া গেছে। তাই খালাম্মা ফকির আইলে খয়রাত দিতে মানা করছে।

– আমারে কি ফকির মনে হয় তোর?

-মামা আমার ভুল হইয়া গেছে মাফ কইরা দেন। আপনে কিছু খাইবেন  মামা?

– হুম খিদে লাগছে সকালে কিছু খেয়ে আসিনি। কি নাস্তা বানাইছিস সকালে?

– গরু মাংস ভুনা  আর পরটা

-অফিস ডে তে হঠাৎ  গরুর মাংস?

– ছোট আফা খাইতে চাইছিল , তাই বানাইছি।

– আচ্ছা নানী না হয় অফিসে তা খালামুনি আর মামা কোথায়??

-ছোট আফা তো কলেজে গেছে,  আইতে ১২ বাজবো। আর ভাই  জান এর কথা আমি জানিনা।

– আচ্ছা যা, তুই তোর কাজ করগা ।

আদ্রিত খাওয়া শেষ করে  ছোট বারান্দায় থাকা পুরাতন এক পা ভাঙা টেবিল টাতে উঠে বসলো, হাতে ডেভিট মাইকেলের টেস্ট অব ব্লাড বই। বারান্দর গ্রিলের বড় বড় ফাঁকা দিয়ে সূর্যের আলো এসে সারা বারান্দায় ভরে গেছে।কলোনীর বিল্ডিং গুলো এল টাইপের। তিন সিড়ি যুক্ত  বিল্ডিং এর মাঝে রাস্তা। সুপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনা। বই পড়তে পড়তে আদ্রিতের চোখটা হঠাৎ লেগে গেছে।

– এই তুই কখন এলি?

– ও খালামনি তুমি?

– হ্যাঁ আমি। তুই যে আসবি আপুতো কালকে বললো না?

– আমি মানা করেছিলাম মা কে। ভেবেছিলাম সারপ্রাইজ দিব তোমাদের।

– তাই নাকি। যাক ভালো করেছিস। তোর সাথে আড্ডা দেওয়া যাবে।

– হুম তুমি এমন ভাব করতেছো যেন তোমার আড্ডা দেওয়ার লোকের  অভাব পরে গেছে।

– কি বলিস এগুলা।

– বুঝতে পারো না দশ নাম্বার ব্রেক আপের পরের ছাগল টা কে শুনি।

-আদ্রিত তোকে দিব একটা কিল। তুই রাশেদ কে ছাগল বললি। ওর মতো হেন্ডসাম ছেলে খুব কম ই আছে।

– বিশ্বাস করতাম যদি অন্য কারো মুখ থেকে শুনতাম। তুমি তো  ময়লাওয়ালা  ছেলেটার ওপর ও ক্রাশ খাইছিলা সব মনে আছে আমার ।

– তুই আমার পিছনে লাগলি কেন বলতো ?

-তোমার ছ্যাসরামির জন্য।

মুহূর্তের মধ্যে কলোনিতে কোথা থেকে যেন একটার  পর একটা পুলিশ  এর বাহারি গাড়ি কলোনী তে ঢুকতে থাকলো। আদ্রিতের খালা  বারান্দা থেকে হাক ছাড়ে,

– ওই মেরী কি হইছে রে, এত পুলিশের গাড়ি কেন?

– আরে শুনলাম ৩২ নং বিল্ডিং এর পুলিশ সাহেব নাকি খুন হয়েছে

– কি বলিস তুই?  সকালে কলেজে যাবার সময় উনার সাথে আমার বাজারের গেটে দেখা হইছিলো

– খালামনি চলো যাই একবার দেখে আসি।

– পুলিশ কেস যাওয়া টা কি ঠিক হবে?

– দূর তুমি ভয় পাও কেন?  আমরা কি চোর নাকি ডাকাত ?

– চল যাই তাহলে।

– ছোট আফা আমিও যামু।

– টুনি তোর গালে  একটা কসে থাপ্পর মারবো। তুই গেলে এই  বাসায় কে থাকবে তোর জামাই?

– খালামনি চলোতো।  যত সব পাগল কোথাকার।

৩২ নং বিল্ডিং কলোনির একবারে শেষ প্রান্তে। সামনে মেইনরোড। কলোনি আর মেইন রোডর মাঝে সু-উচ্চ সীমানা প্রাচীর। প্রাচীরের ওপরে কাটাঁ তারের বেড়া। বাতাসের কোনো অভাব না থাকলেও কলোনির এই দিকটায় সূর্যের আলোর  ভালোই দীনতা রয়েছে। প্রাচীরের ওপারের মেইন রোডর পাশের অভ্রভেদী বিল্ডিং গুলোর জন্য আলো বাধা পায়। ২৮ নং বিল্ডি এর কাছে  যেতেই আদ্রিত দেখলো সারা রাস্তায় রক্তে লাল হয়ে গেছে। আর ডেডবডিটা সিড়ি আর রাস্তার মাঝে পরে আছে। আদ্রিত হঠাৎ দেখলো  সাদা শার্ট কালো প্যান্ট পরা ২৫ – ২৬ বছরের এক যুবক ডেডবডির আশে পাশের সব কিছু খুব ভালোভাবে দেখছে।

-আরে সাদাত ভাইয়া আপনি এখানে?

– তুমি কে? তোমাকে চিনলাম না তো ।

– ভাইয়া আমি আদ্রিত। আপনারা যখন কেশবপুরে আমাদের পাশের বাসায়  থাকতেন।

– ও তুমি সেই আদ্রিত? অনেক বড় হয়ে গেছো। আমিতো তোমাকে চিনতেই পারিনি।

–  স্বাভাবিক ভাইয়া। আপনারা তো ছয় বছর আগে  আঙ্কেলের টান্সফারের জন্য কেশবপুর থেকে চলে গিয়েছিলেন।

– হ্যা। আমি এখন বাংলাদেশে পুলিশের স্পেশাল ক্রাইম ব্রাঞ্চের জুনিয়ার অফিসার।

– ও তার মানে আপনি এই কেসের ইনভেস্টিগেটশন অফিসার।

–  হুম তুমি ঠিক ধরেছো। তা তুমি এখানে কি করে এলে ?

– আমার নানী বাড়ি এখানে । ভাইয়া একটা কথা বলবো?

– হ্যা অবশ্যই বলো।

– আমার ছোট বেলা থেকেই অনেক ইচ্ছা এমন একটা কেসের ইনভেস্টিগেশন সরাসরি কাছে থেকে দেখবো।

– বুঝতে পারছি  আর বলতে হবেনা। কিন্তু এগুলো তো খুব কনফিডেনসিয়াল বিষয়। তাহলে তোমাকে আমার কোয়ার্টারে থাকতে হবে কয়দিন। পারবে?

– হ্যা খুব পারবো ভাইয়া।

– নাহিন সাহেব আপনি একঘন্টার মধ্যে কেস ফাইল রেডি করেন। আর ডেডবডি পোস্টমডেম এর জন্য পাঠান।

– ইয়েস স্যার।

সময়ঃ২১ নভেম্বর, বিকাল ৪.৩০

পুলিশ হেডকোয়ার্টার, রাজারবাগ, ঢাকা।
————————————————————

সাদাত সাহেব তার দুই কামরার কোয়ার্টারের দরজা খুলতে খুলতে,

– তারপর, আদ্রিত  আঙ্কেল  আন্টি কেমন আছে?

– ওরা সবাই ভালো আছে। আপনি এখানে একাই থাকেন?

– হুম। বাবার চাকরি এখনো বছর চারেক আছে, বাবা মা চাঁদপুরে থাকেন।মা মাসে একবার করে আসেন আমার এখানে।

– তা ভাইয়া ভাবি কে কবে দেখবো।

– অবশ্যই আমার বিয়ের পর।

– ভাবি কি সিলেক্টেড, নাকি  সিলেক্টে করতে হবে?

– হা, হা,হা, আদ্রিত সিলেক্ট করতে হবে ভাইয়া।

– আচ্ছা তা ন হয় করে দিবো।

– তা, আপনার  কি কি টাইটেরিয়া আছে শুনি?

– সুন্দরী,ভালো, পর্দানশীন, নামাজী।

– আচ্ছা, আচ্ছা বুজেছি।

– আদ্রিত যদিও এখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল তবুও চলো একটু ভাত খেয়ে নি।

– হুম চলেন । তা ভাইয়া আপনি প্রেম টেম করেনি?

– আর প্রেম! পর্দানশীন মেয়ে পেলে তো।

– ভাইয়া অনেকের মুখেই শুনছি হিজাব পরা মুখ ঢাকা মেয়েদের সাথে প্রেম করতে চায়।  কিন্তু যেই মেয়েটা হিজাব পরা মুখ ঢাকা তার তো প্রেমই করার কথাই না। কেননা বিয়ের আগে তার প্রেমিক তো বেগানাপুরুষ।

– ঘাপলা আছে আদ্রিত। তবে ডেভিল কে অ্যানজেল বানানো আমার কাজ ।

– হইসে ভাই। হইসে।

– স্যার আসবো?

– আরে নাহিন সাহেব আসেন আসেন।

– স্যার কেস ফাইল রেডি।

– তাই! পড়েন তাড়াতাড়ি।

নামঃ আজিজুল রহমান

পেশাঃ পুলিশের এসপি ( সাত মাস হলো এল.পি. আর এ গেছেন)
বয়সঃ ৬০

খুনের স্থান ও সময়ঃ
——————————-
মতিঝিল এ.জি.বি কলোনি। ২৮ নাম্বার বিল্ডিং এর সিঁড়ি ও রাস্তার মাখনে।পোর্স মডেম অনুযায়ী খুনের সময় ১১.৩০ থেকে ১২.০০ টার মধ্যে।

পোর্স্ট মডেম রিপোর্ট অনুযায়ী ভিক্টিমের বডি থেকে খুব যত্ন সহকারে তার হৃদপিণ্ড টা বের করে নেওয়া হয়েছে।

– আচ্ছা  তার পরিবারে কে কে আছেন?

– স্যার, তার স্ত্রী আর তাদের এক ছেলে যিনি  গত দুই বছর ধরে অস্ট্রেলিয়াতে থাকেন আর খুনের সময় তার স্ত্রী বারডেমে গিয়েছিল রেগুলার চেক-আপ এর জন্য।

– আচ্ছা আপনি কলোনির গেইট গুলোর সিসিটিভি ফুটেজ দেখেছেন??

– হুম স্যার দেখেছি।  তবে সন্দেহর কিছু দেখিনি।

– আচ্ছা ওগুলো আমার কাছে পাঠিয়ে দিন।

সূর্য হেলতে শুরু করেছে, ক্লান্ত পাখিরা নিজ বাসায় ফিরতে শুরু করছে, এই ইট পাটকেলের শহরের একপ্রান্ত থেকে  দূর দুরান্তে ছুটে চলছে ট্রেন।, ক্লাস শেষ করে সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্র রা হেলেদুলে হাঁটতে শুরু করেছে বাড়ির দিকে, সারাদিনের কাজ শেষ করে লোকাল বাসে পায়ের চাপা খেয়ে,চাপাচাপিতে  মানুষের বগলের ঘামের বোটকা গন্ধ নাকে নিয়ে, রাজ্যোর ট্রাফিক জ্যাম  টপকিয়ে বাড়ি ফিরেছে মানুষজন। বাড়ি ফিরে তিন পাখা ওয়ালা ফ্যানের নিচে একটু প্রশান্তির ছায়া খুজছে কেউ কেউ। নিয়ন আলোর ল্যাম্পপোস্ট গুলো সন্ধ্যায় পথচারীদের দিশা দেখাচ্ছে। কিন্তু সেই কলোনি তে এখন স্তব্ধতা। প্রতিদিন সন্ধ্যা বেলা যে মোটা নারী পুরুষ গুলো পুরো কলোনি দশ বারো বার চক্কর মারে তারা এখন ঘরো বসেই খুনের রহস্য খুজছে নিজের মত করে। পাঁচ বছরের ছোট মেয়েটা ও আধ আধ গলায় অফিস ফেরত বাবাকে খুনের কথা বলছে। আদ্রিতের ক্লান্ত দেহটা সাদাতের ওপাশের ঘরে লুটিয়ে পড়েছে। সাদাত সাহেব নিজোর ঘরে ঘুমিয়ে সাড়া। রাত দশ টা বোধ হয় হবে। রাতের খাবার নিয়ে এসেছে রাধুনি রহমত।

– আদ্রিত উঠো রাতের খাবার খেতে হবে যে ভাইয়া।

– ও সাদাত ভাইয়া আপনি, আমি তো খাটে এসে বসতে না বসতেই কখন যে ঘুমিয়ে গেছি মনেই পরেনা।

– স্বাভাবিক সারাদিন যা ধকল গেলো তোমার।

– আচ্ছা ভাইয়া সিসি টিভি ফুটেজ আপনি দেখেছেন?

– হুম। দেখে আমি স্কেচ করতে দিয়েছি সন্দেজনক একজনের ছবি।

ইতোমধ্যেই আদ্রিতের মোবাইলে ফোন,

– কিরে সাইকো আমাদের ভুলে গছিস নাকি?

– আরে কি বলিস বাচ্চার মামা তোকে ভোলা যায়?কি হইছে বল

– কালকে আমার জন্মদিন মনে আছে?  উইসই তো করলিনা।

– হেপি বার্থ ডে। খুশি এবার?

– হইছে। কালকে ঢাকায় তোদের খাওয়াবো

– তোদের মানে?

– কালকে আমরা সাবাই কেশবপুর থেকে ঢাকায় আসবো। আর একটা সারপ্রাইজ ও আছে।

– কি যে বলিস তুই। জন্মদিন টা তোর সারপ্রাইজ দিবো আমরা। এখন সব উল্টো।

২৪ নভেম্বর
——————
– ভাইয়া খুনী কিন্তু পাকা হাতের লোক।

– হুম আমারো তাই মনে হয়েছে। কেননা একজন কার্ডিওলজিস্ট ছাড়া এত কম সময়ের মধ্যে রাস্তা ও সিড়ির মাঝখানে কেউ একটা বডি থেকে হৃৎপিণ্ড
আলাদা করতে পারবেনা।

– এটাই সবচেয়ে বড় ইভিডেন্ট। খুনী একজন কার্ডিওলজিস্ট।

– স্যার, কালকে রাতে বিখ্যাত অভিনেতা সমরেশ মল্লিক খুন হয়েছে। খুনের টাইপ আগের মতই।

– ও মাইগড!  তারমানে সিরিয়াল কিলার? এই কেসের ইনভেস্টিগেটর কে?

– নিপুন স্যার।

– আগের দিন বিখ্যাত রাইটার ফাহিম তালুকদার ও খুন হলো।  আজ আবার সমরেশ মল্লিক।

– সাদাত ভাইয়া আমি আজকে একটু বাইরে যাবো আমার সব বন্ধু আসছে।

– আচ্ছা গাড়ির ড্রাইভার কে বলছি তোমাকে নিয়ে যেতে।

মিরানের জন্মদিনের খাওয়া দাওয়া শুরু এখনো হয়নি।

– কিরে মিরান কার জন্য অপেক্ষা? সবাই তো এসেই পরেছে ।

– আরে আদ্রিত আমার স্পেশাল গেস্ট ই তো এখনো আসেনি।

– কে আবার?

– আরে বলতে বলতে এসে গিয়েছে। আদ্রিত উনার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম।

– উনার চোখ দুটো খুব চেনা চেনা লাগছে। কই যেন দেখেছি।

– আরে কই আবার ইউটিউবে। উনি তো  বাংলাদেশের টপটেন ইউটুবারের একজন।

– হবে হয়তো।

– শুধু তাই না আদ্রিত এই নিব্রাস ভাইয়া কিন্তু আমেরিকা থেকে কার্ডিওলজি পড়ে এসেছে। কিন্তু ডাক্তারি বাদ দিয়ে ইউটুবিং করে।

– তাই নাকি নিব্রাস ভাইয়া।

– আরে না!  তেমন কিছু না। আচ্ছা কালকে আমি একটা পার্টির আয়োজন করবো

– মিরান তোমার এই সব বন্ধু দের নিয়ে এসো কিন্তু।

– নিব্রাস ভাইয়া  নিশ্চয়ই পার্টি টা গোল্ডেন প্লে বাটনের জন্য?

– কালকে আসলেই বুজবা মিরান।

সাদাত তার হালকা গোলাপী রংয়ের দুই ঠোঁটের ফাঁকে সিগারেটটা ধরে টানদিয়ে দুই চোখ বন্ধ করে ফু দিয়ে খুব যত্ন সহকারে ধোয়া বের করতে লাগলো। নিমিষেই ধোয়া গুলো কালো জানালার গ্রীলের ফাঁকা দিয়ে বের হয়ে বাহিরো বাতাসে কুয়াশার সাথে মিলিয়ে যাচ্ছে। আদ্রিত নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো।

– কি আদ্রিত একটা টান দিবা নাকি?

-না ভাইয়া এই ভালো অভ্যাস টা এখনো হয়নি।

– ধূর, কিযে বলো তোমার মতন বয়সে রোজ ৭- ৮ টা করে টানটাম।

– ভাইয়া কেসের কি খবর?

– আজিজ সাহেব যে থানায় জয়েনিং করেছিলো সেখান থেকেই হদিস মিলেছে।

– হৃৎপিণ্ড থেকে রক্তের সঞ্চারন আর রক্তেই হৃদস্পন্দন তাই না ভাইয়া?

– তুমি জানলে কিভাবে?

– হা,হা,হা আপনার সাথে থেকে থেকে গোয়েন্দা হয়ে গেছি।

শীতের  হালকা রোদের একটা বিকেল। নিব্রাসের  জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন শুরু হবে হবে করছে ।

– নিব্রাস ভাইয়া আপনার জন্য একটা গল্প লিখছি।

– তাই নাকি?  তুমি আবার গল্প ও লিখো?

– ওই আরকি শুনবেন?

– শোনাও দেখি।

–  যশোরের দরিরামপুরের থেকে বারো বছর বয়সী একটি মেয়ে হারিয়ে যায়। সেই মেয়ে টার বাবা মা থানায় এসে নিখোঁজ ডায়েরি করে। থানার ওসি আজিজুর রহমান  দুইদিন পর একটা গেস্ট হাউজ থেকে মেয়েটি কে তার লাভারের সাথে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে উদ্ধার করে। শুধুতাই না তারা দুইদিনে একাধিক বার শারীরিক মিলিন ও করে। মেয়েটির বাবা থানায় ছেলেটার নামে ধর্ষণের মামলা সহ আরো অনেক মামলা দিতে চায় কিন্তু ওসি আজিজুর রহমানের কারনে কোনো মামলা হয়না।

– আরে কি বলো এখনেই শেষ! নিব্রাস শুরু করলো, ওই পুলিশের ওসি আজিজুর রহমান ছিলো একটা  জানোয়ারের বাচ্চা। ও সেই ছেলেটার বাবকে যখনিই দেখতো তখনই অপমান করতো। ওই ওসির কারনেই তার বাবা মারা যায়। ওই ওসির কারনেই আমি আজও রাতে ঘুমাতে পারিনা। ওর কারনেই আমি রুপসা কে হারিয়েছি। কারনে আমাকে সবাই ঘৃণা করে।

– নিব্রাস সাহেব আপনি না হয় প্রতিশোধের জন্য ওসি আজিজুর রহমান কে খুন করেছেন। কিন্তু বাকি দুটো খুন কেন করলেন? ওরা তো কোনো অপরাধ করেনি।

– সাদাত রহমান আপনি এত বড় ইনভেস্টিগেটর আপনি বের করুন । হা হা হা হা হা হা

– আমাদের কাজতো আমরাই করবোই, আপনি এখন সরকারি শ্বশুর বাড়িতে চলুন।

পরদিন সকাল দশটা।

– আদ্রিত নিব্রাসের বাসা থাকে তিনটা হৃৎপিণ্ডই পেয়েছি  আমারা। কিন্তু কিছুতেই বলছে না ও কেনো বাকি দুটো খুন করলো।

– ভাইয়া আমি বলি। নিব্রাস আসলে একধরনের সাইকোলজির রোগী। সে সম্ভবত  ক্লাসিক  ডি প্রাইভড্ সিনড্রোম  এ আক্রান্ত ।

– কি বলো?

– এই রোগের  রোগীরা সাধারণত  সবসময়ই  অতিতের কোনো ঘটনা তার চোখের সামনে ঘটলে সেগুলো সে সত্যি মনে করে।

– কিন্তু খুনের সাথের এটার সম্পর্ক কি?

– সাদাত ভাইয়া আছে।  আপনি দেখেন,  রাইটার ফাহিম তালুকদার যিনি কিনা সবসময় করুন প্রেমের কাহিনি রচনা করেন তার কোনো গল্পেই প্রেমিক প্রেমিকার মিলতো  হয়ইনা। আর সমরেশ মল্লিক যিনি ভিলেনের অভিনয় করেন। তার কারনে সিনেমায় নায়ক নায়কাদের মিল হতোনা । এগুলা যখন নিব্রাস দেখতো তখন সে সত্য মনে করতো। আর সবসময় প্রতিশোধ নিতে চাইতো। এই রোগে মানুষের মস্তিকে এমন একটা সৃৃষ্টি হয়

যার কারনে সব সময় রোগী  সব সময় প্রতিশোধ পরায়ন থাকে।
– তাইতো আজিজ সাহেব ওর সাথে কিছুই করেনি সব আমরা রেকর্ড থেকে বের করেছি। এছাড়া নিব্রাসে বড়  ভাই ও বলেছে  সে কথ। কিন্তু সাইকোলজির বিষয়ে তুমি এত কিছু জানলা  কিভাবে?

– এই যে, ফাংশনস্ অব  সাইকোলজি থেকে।

আসলেই  হৃৎপিন্ডেই রক্তের সঞ্চানল, আর রক্তেই হদস্পন্দন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here